পাঠ সংক্ষেপ

যেসব কারণে মানুষের আকল লোপ পায় তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, মাদকদ্রব্য সেবন করা। যখন কোনো ব্যক্তি মদ পান কিংবা অন্যকোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে তখন সে জ্ঞান-বুদ্ধি শূন্য হয়ে পড়ে। হারিয়ে ফেলে মানবতা ও মনুষ্যত্ববোধ। তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে অন্যায় ও অপরাধ প্রবনতা। ফলে সে আল্লাহকে ভুলে যায়, নিজের ওপর যুলম করে, জীবনকে বরবাদ করে, ছেলে-মেয়েকে ইয়াতীম করে এবং স্ত্রীকে করে স্বামীহারা।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، حَرَّمَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ رَحْمَةً بِعِبَادِهِ، وَحِمَايَةً لَهُمْ مِمَّا يَضُرُّهُمْ، وَأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ، خَلَقَ الْإِنْسَانَ وَأَحَلَّ لَهُ الطَّيَبَاتِ، وَحَرَّمْ عَلَيْهِ الْخَبَائِثَ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، صَلَّىَ اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ وَسَلَّمَ تَسْلِيْماً كَثِيْراً، أَمَّا بَعْدُ :

প্রিয় মুসল্লী ভাইয়েরা! আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানকে অসংখ্য মাখলুকের ওপর সুউচ্চ মর্যাদা দান করেছেন। যেমন তিনি পবিত্র কুরআনে বলেছেন:

{وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آَدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا}

‘ আর আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি এবং আমি তাদেরকে স্থলে ও সমুদ্রে চলাচলের বাহন দান করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি উত্তম রিযক। আর আমি যা সৃষ্টি করেছি তাদের থেকে অনেকের ওপর তাদেরকে অনেক মর্যাদা দিয়েছি’ (সূরা বনী ইসরাঈল:৭০)

আল্লাহ তাআলা মানুষকে এমন অনেক বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন, যা তিনি অন্য কোনো মাখলুককে করেননি। তিনি মানুষকে জ্ঞান দিয়েছেন, বোধশক্তি দিয়েছেন। দিয়েছেন চিন্তা-ফিকির করার ক্ষমতা। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, আল্লাহ তাআলা মানুষকে যত বৈশিষ্ট্য ও নেয়ামত দিয়েছেন তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো, আকল বা জ্ঞানের নেয়ামত। কেননা জ্ঞান হলো এমন এক মহামূল্যবান বস্তু যদ্বারা মানুষ ভালো এবং মন্দের পার্থক্য করতে পারে। পারে উপকারী ও ক্ষতিকর জিনিসের মধ্যে ব্যবধান করতে। শুধু তাই নয়, জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে মানুষ তার কাজকর্মকে সুশৃঙ্খল করতে পারে এবং জীবনকে পৌঁছে দিতে পারে উন্নতির উচ্চশিখরে।

যখন মানুষের জ্ঞান লোপ পায় তখন তার মধ্যে এবং অন্যান্য প্রাণী ও জড়পদার্থের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। এমতাবস্থায় সে যেমন তার নিজের কোনো উপকার করতে পারে না তেমনি সে অন্য কারো উপকার করতেও সক্ষম হয় না। সে বরং পরিবার ও সমাজের জন্য বিরাট এক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

যেসব কারণে মানুষের আকল লোপ পায় তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হলো, মাদকদ্রব্য সেবন করা। যখন কোনো ব্যক্তি মদ পান কিংবা অন্যকোনো নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে তখন সে জ্ঞান-বুদ্ধি শূন্য হয়ে পড়ে। হারিয়ে ফেলে মানবতা ও মনুষ্যত্ববোধ। তার মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে অন্যায় ও অপরাধ প্রবনতা। ফলে সে আল্লাহকে ভুলে যায়, নিজের ওপর যুলম করে, জীবনকে বরবাদ করে, ছেলে-মেয়েকে ইয়াতীম করে এবং স্ত্রীকে করে স্বামীহারা।

মাদকাসক্তির এই সর্বনাশা ব্যাধি আজ মুসলমানদের মধ্যেও অনুপ্রবেশ করেছে। মুসলমান যুব সমাজকে ধ্বংস করার জন্য কাফির মুশরিকরা অত্যন্ত কৌশলে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছে এ ব্যাধি। অথচ মুসলমানরা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ গাফেল। তাদের খবরও নেই যে, শত্র“রা তাদেরকে বিভিন্ন উপায়ে ধ্বংসের কোন্ স্তরে পৌঁছে দিচ্ছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

{وَلَا يَزَالُونَ يُقَاتِلُونَكُمْ حَتَّى يَرُدُّوكُمْ عَنْ دِينِكُمْ إِنِ اسْتَطَاعُوا}

‘ আর তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তোমাদেরকে তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, তারা যদি পারে ’ (সূরা বাকারা:২১৭)।

প্রিয় ভাইয়েরা! আমার আশ্চর্য লাগে ঐ ব্যক্তির জন্য, যে স্বীয় অর্থ দিয়ে এমন জিনিস ক্রয় করে, যা তার জন্য ধ্বংস ও বরবাদী ডেকে আনে। আরো আশ্চর্য লাগে এজন্য যে, মাদকাসক্ত ব্যক্তি তার সামনেই অসংখ্য মানুষকে মাদকাসক্ত হয়ে ধ্বংস হতে দেখে কিন্তু সে তা থেকে কোনো প্রকার শিক্ষা গ্রহণ করে না বরং স্বীয় জ্ঞান-বুদ্ধি হারিয়ে জ্ঞানহীনদের কাতারে শামিল হয়।

হাসান বসরী রহ. বলেন, যদি আকল-বুদ্ধি ক্রয়যোগ্য কোনো জিনিস হতো তাহলে লোকজন তার মূল্য অতিমাত্রায় বাড়িয়ে দিত।

ভাই সকল! যে সকল খাদ্য ও পানীয় মানুষের আকল-বুদ্ধিকে বিনষ্ট করে, বিলুপ্ত করে, অথবা নিস্তেজ করে দেয় সে সকল খাদ্য ও পানীয় অর্থাৎ সকল প্রকার মাদক দ্রব্য শরীয়তের দৃষ্টিতে হারাম।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ}

‘ হে ঈমানদারগন! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা পূজার বেদি ও ভাগ্য নির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক, শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও’ (সূরা আল মায়িদা:৯০)

এ আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, মদ বা শরাব নাজাসাতুল আইন তথা প্রকৃত নাপাক। কেননা আল্লাহ তাআলা তাকে رِجْسٌ বলেছেন। আর আরবদের পরিভাষায় رِجْس ঐ নিকৃষ্ট ও খারাপ জিনিসকে বলে যার ব্যাপারে মনের মধ্যে ঘৃণা আসে।

সাহাবায়ে কিরাম মদ সংক্রান্ত আয়াত থেকে শুধু মদ হারাম হওয়ার বিষয়টিই অনুধাবন করেননি বরং তারা এটাও বুঝেছেন যে, মদ পান করা শিরক সমতুল্য গুনাহ। আর শিরক হলো, সবচে’ বড় ও মারাত্মক গুনাহ ।

ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন মদ হারাম হওয়া সংক্রান্ত আয়াত নাযিল হলো তখন সাহাবায়ে কেরাম একে অপরের সাথে সাক্ষাৎ করে পরস্পরে বলতে লাগলেন, মদ হারাম করা হয়েছে এবং তাকে শিরক সমতুল্য গোনাহ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে (তাবারানী, সহীহ)।

আর একথা তারা এ কারণে বলেছিলেন যে, আল্লাহ তাআলা মদ সম্পর্কে বলেছেন: رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ ‘ নাপাক, শয়তানের কর্ম’। আর শিরক সম্পর্কে তিনি বলেছেন:

{فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ}

‘সুতরাং তোমরা মূর্তিসমূহের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাকো’ (সূরা আল হজ : ৩০)।

মদ পান হারাম হওয়া, তা থেকে বিরত থাকা এবং তার নানাবিধ অপকারিতা, খারাবি ও শাস্তি সম্পর্কে পবিত্র কুরআন ও হাদীস শরীফে অনেক বর্ণনা ও সাবধানবাণী উচ্চারিত হয়েছে। যেমন হাদীসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে ওয়া‘লা রাযি. বলেন, আমি ইবনে আব্বাস রাযি. কে মদ বেচাকেনা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এক বন্ধু ছিলেন ছাকীফ বা দাউস গোত্রের। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে সাক্ষাত করে একপাত্র মদ হাদিয়া দিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন- হে অমুক! তুমি কি জান না যে, আল্লাহ তাআলা মদ হারাম করেছেন? এ সময় লোকটি তার গোলামকে বলল, ‘যাও, এগুলো বিক্রি করে এসো।’

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি তাকে কী করতে আদেশ করেছ? সে বলল, আমি তাকে এই মদ বিক্রি করার আদেশ করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যিনি মদ পান হারাম করেছেন তিনি তার বিক্রয়ও হারাম করেছেন। একথা শুনে লোকটি উপত্যকার নরম মাটিতে সমস্ত মদ ঢেলে দেয়ার নির্দেশ দিলেন (মুসলিম)

আবূ হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত অন্য এক হাদীসে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মেরাজের রাত্রে ইলইয়া নামক স্থানে আমার কাছে দু’টি পাত্র আনা হলো। পাত্র দু’টির একটিতে ছিল মদ এবং অপরটিতে দুধ। আমি উভয় পাত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করলাম। অতঃপর আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তখন জিবরীল আ. বললেন, সমস্ত প্রশংসা ঐ আল্লাহর জন্য যিনি আপনাকে ফিতরতসুলভ কাজ করার তাওফীক দিয়েছেন। যদি আপনি মদের পাত্রটি গ্রহণ করতেন তাহলে আপনার উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে যেত (বুখারী)।

এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

(مَا مِنْ أَحَدٍ يَشْرَبُهَا فَتُقْبَلَ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِيْنَ لَيْلَةً، وَلَا يَمُوْتُ وَفِيْ مَثَانَتِهِ مِنْهُ شَيْءٌ إِلَّا حُرِّمَتْ بِهَا عَلَيْهِ الْجَنَّةُ)

‘ কোনো ব্যক্তি মদ পান করলে তার চল্লিশ দিনের নামায কবুল হয় না। আর কোনো ব্যক্তি যদি এভাবে মারা যায় যে, তার মূত্রথলিতে সামান্য পরিমাণ মদ ছিল তাহলে তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেওয়া হবে’ (তাবারানী, সহীহ)।

যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মদ পান করবে সে আখেরাতে পবিত্র শরাব পান থেকে বঞ্চিত হবে। হাদীসে এসেছে :

(مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ فِيْ الْدُّنْيَا، ثُمَّ لَمْ يَتُبْ مِنْهَا حُرِمَهَا فِيْ الْآخِرَةِ.)

‘ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবনে মদ পান করবে অতঃপর সে তাওবা না করে মারা যাবে, আখেরাতে তাকে শরাব পান থেকে বঞ্চিত রাখা হবে’ (বুখারী ও মুসলিম)।

অন্য এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদের সাথে জড়িত দশ ব্যক্তির ওপর লানত করেছেন:

(لَعَنَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي الْخَمْرِ عَشْرَةً عَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَشَارِبَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُوْلَةَ إِلَيْهِ وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَآَكِلَ ثَمَنِهَا وَالْمُشْتَرِيَ لَهَا وَالْمُشْتَرَى لَهُ)

‘ এক. নিজের জন্য অথবা অন্যের জন্য মদ প্রস্তুতকারী। দুই. নিজের জন্য অথাব অন্যের জন্য মদপ্রস্তুতের নির্দেশ প্রদানকারী। তিন. পানকারী। চার. বহনকারী। পাঁচ. যার জন্য বহন করা হয়। ছয়. পরিবেশনকারী। সাত. বিক্রেতা। আট. মদ বিক্রয়ের মূল্য ভক্ষণকারী। নয়. ক্রয়কারী। দশ. যার জন্য ক্রয় করা হয় (তিরমিযী, হাসান-সহীহ)।

নেশা বা মাদকদ্রব্য অল্প হোক বা বেশী হোক হারাম। কেননা অল্পই বেশীর দিকে ধাবিত করে। যেমন জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে মাদকের বেশী মাত্রা নেশার সৃষ্টি হয়, তার অল্পও হারাম’ (আবু দাউদ)।

যেহেতু মাদকদ্রব্যের অল্প-অধিক সবই হারাম তাই হাশীশ ও এ জাতীয় অন্যান্য মাদক থেকে অবশ্যই দূরে থাকতে হবে। কেননা এগুলো মানব দেহকে ধ্বংস করে এবং মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধিকে বিলুপ্ত করে। শুধু তাই নয়, মাদকাসক্ত ব্যক্তি মানুষের চোখে বিশ্বাসহীন ও ঘৃনিত হয়ে পড়ে। তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং তার দূরদর্শিতা হারিয়ে যায়। এমনকি শেষ পর্যন্ত তার অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, কোনো কারণ ছাড়াই সে কখনো হাসে, কখনো কাঁদে। তার চোখ দু’টো থাকে অশ্র“সিক্ত। যেন মৃত্যু তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে।

ইসলাম ও মুসলমানদের শত্র“রা মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যগুলোকে বিভিন্ন আকর্ষণীয় ও সুন্দর লেবেলে আমাদের সামনে উপস্থাপন করছে। মূলত এগুলো সবই শয়তানী কাজ। তাই জীবনে সফল হতে হলে আমাদের উচিত যে কোনো মূল্যে এ থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ, أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُوالغفور الرحيم

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدَاً عَبْدُ اللهِ وَرَسُوْلُهُ وَصَفِيُّهُ مِنْ خَلْقِهِ وَخَلِيْلُهُ، بَلَّغَ الرَّسَالَةَ وَأَدَّى الْأَمَانَةَ وَقَادَنَا إِلَى رِضْوَانِ اللَّهِ صَلَى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَىَ آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيْماً كَثِيْرَا، أَمَّا بَعْدُ :

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! মাদক এমন এক নেশা, যে এ পথে একবার পা বাড়িয়েছে, সে সাধারণত ঐ পথ থেকে আর ফিরে আসতে পারে না। হাঁটিহাঁটি পা পা করে সে এগিয়ে যায় ধ্বংসের দিকে। মৃত্যুর দিকে। এ যেন স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া।

মাদকাসক্তি যদিও সাময়িক আনন্দ দেয়, কৃত্রিম শক্তি বৃদ্ধি করে কিন্তু এ সামান্য উপকারিতার তুলনায় এর ক্ষতির দিকটা এতই বিস্তৃত ও গভীর যে, অন্য কোনো কিছুতেই সচরাচর এত ক্ষতি দেখা যায় না। যেমন-

ধর্মীয় ক্ষতি: মহান আল্লাহ তাআলা মানুষকে একমাত্র তাঁর ইবাদত করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এ মহান উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক যে জিনিসটি তা হলো, মাদকাসক্তি। মাদকাসক্তি মানুষকে নামায , রোযা, অন্যান্য ইবাদত, সর্বোপরি আল্লাহর যিকর তথা স্মরণ থেকে দূরে রাখে। বরং তাকে উল্টো লিপ্ত করে সর্বপ্রকার পাপাচার ও অশ্লীলতায়। উদ্বুদ্ধ করে মারামারি, হানাহানি, চুরি, ডাকাতি, হাইজ্যাক, লুণ্ঠন, পতিতাবৃত্তি ও মাদকদ্রব্য ক্রয়-বিক্রয়ের মতো জঘন্যতম ও নিকৃষ্ট কাজে। ইরশাদ হয়েছে:

{إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ.}

‘ শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্র“তা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর চায় আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদেরকে বাধা দিতে। অতএব তোমরা কি বিরত হবে না?’ (সূরা আল মায়েদা: ৯১)

দৈহিক ক্ষতি: মাদকাসক্তি মানবদেহে অত্যন্ত মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে হজমশক্তি লোপ পায়। শিরা ও ধমনীর শক্তি ক্ষয় হয়। গলদেশ ও শ্বাসনালীর প্রচুর ক্ষতি হয়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি যক্ষা, জণ্ডিস প্রভৃতি রোগে আক্রান্ত হয় এবং অকাল বার্ধক্যে উপনীত হয়ে কষ্টদায়ক মৃত্যুর দিকে ধীওে ধীরে অগ্রসর হয়।

স্বাস্থ্যের ওপর মাদক দ্রব্যের প্রভাব অত্যন্ত— ভয়াবহ। এগুলোর ব্যবহারে সুঠাম দেহ এবং লাবণ্যময় অবয়বও স্থায়ী থাকে না। মাদকদ্রব্য সেবনের ফলে মানুষ একেবারে অস্বাভাবিক অবস্থায় উপনীত হয়। এমনকি এক সময় তা ছিনিয়ে নেয় সম্পূর্ণ অনুভূতি শক্তিও। তাই তো দেখা যায়, মাদকসেবীরা অনেক সময় মাতাল হয়ে আবোল তাবল বলতে থাকে। তারা নিজেরাও জানে না, তাদের মুখ দিয়ে কী বের হচ্ছে। এ কথাটিই কোনো এক কবি ব্যঙ্গ করে বলেছেন:

এক ছিলিমে যেমন তেমন, দুই ছিলিমে মজা

তিন ছিলিমে উজির নাজির, চার ছিলিমে রাজা!

অর্থাৎ মাদকদ্রব্য সেবনের সময় প্রথমে মনে একটু অস্বাভাবিক আনন্দবোধ জাগ্রত হয়। ফলে নিজেকে সে মন্ত্রী, এমপি এমনকি রাজা-বাদশাহও মনে করতে থাকে। এতে সে বেপরোয়া হয়ে যা মনে চায় তাই করতে থাকে। কিন্তু মনের এই আনন্দলোকে কিছুক্ষণ ঘুরপাক খাওয়ার পর দেহের মধ্যে মাদকের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।

যারা মাদকের নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে তাদের স্মরণশক্তি দ্রুত হ্রাস পায় এবং এই হ্রাসের পরিমাণ ক্রমশঃ বাড়তে থাকে। এমনকি এক পর্যায়ে তাদের সম্পূর্ণ স্মরণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। যার ফলে কোনো কাজে আর মনোযোগ থাকে না। চলাফেরা এলোমেলো হয়ে যায়। মনের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক বিভীষিকাময় কঠিন অবস্থা। দেহের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক কমে যায়। পাকস্থলিতেও দেখা দেয় নানারকম সমস্যা। নেশা বেশী হলে চোখে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। কিছুক্ষণ পর নেশা ছুটে গেলে শরীরে শুরু হয় অস্থিরতা ও যন্ত্রণা। ফলে যন্ত্রণার তাড়নায় আরো মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করার জন্য সে পাগলপ্রায় হয়ে পড়ে। অনেক সময় এই নেশার দ্রব্যাদি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেককে অত্যন্ত জঘন্যতম অপরাধে লিপ্ত হতে দেখা যায়। যেমন, চুরি, ডাকাতি, লুটতরাজ ইত্যাদি।

মানসিক কুফল: মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও মস্তিষ্কের ওপর মাদকাসক্তির প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক ও ক্ষতিকর। ফলে মাদকাসক্ত ব্যক্তি মাতাল ও লজ্জাহীন হয়ে পড়ে। কথাবার্তা বেশী বলে। এমনকি নিজের অজান্তে অনেক গোপন কথাও সে বলে ফেলে।

নৈতিক ও সামাজিক ক্ষতি: মাদকাসক্তি শুধু মানবতা ও নৈতিকতা বিরোধী কার্যকলাপকেই উদ্বুদ্ধ করে না, বরং তা মানুষকে যাবতীয় মন্দ কাজের দিকেও ধাবিত করে। তা মানুষকে করে তোলে অস্থির ও উশৃঙ্খল। নরহত্যা, ব্যভিচার, ছিনতাই, রাহাজানী ইত্যাদি জঘন্যতম অপরাধের অধিকাংশই এই বিষধর মাদকাসক্তির পরিণাম।

অর্থনৈতিক ক্ষতি: মাদকাসক্তি মানুষের অর্থনৈতিক দিক থেকেও বিপুল ক্ষতি সাধন করে। নেশার তাড়নায় মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং পরিবার পরিজন থেকে শুরু করে সমাজের আরো দশজনের টাকাপয়সাও লুটেপুটে জাতীয় জীবনে অর্থনীতিকে পর্যদুস্ত করে তোলে। সৃষ্টি করে সর্বত্র অশান্তি। এমনিভাবে মাদকাসক্তি প্রাচুর্যের অধিকারীকেও নিঃস্ব ও ভিখারী করে দেয়। দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ এ পথে অপচয় হয়।

জাতীয় জীবনে ক্ষতি: মাদকাসক্ত জাতি পৃথিবীতে দারুণ বিপর্যয় ঘটায়। মাদকাসক্ত ব্যক্তি যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত হয়, তবে তার দ্বারা সে বিভাগের ধ্বংস অনিবার্য। যে জাতির যুবসমাজ মাদকাসক্ত তাদের আগামী প্রজন্মও ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে বাধ্য। মাদকাসক্ত পিতামাতার সন্তান বুদ্ধিহীন ও উশৃঙ্খল হয়।

প্রতিকার: মাদকাসক্তির করাল গ্রাস থেকে সমাজকে মুক্ত করতে হলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের পক্ষ থেকে নিম্নবর্ণিত পদক্ষেগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে:

পারিবারিক কর্তব্য: প্রত্যেক পরিবার প্রধানের উচিত তারা যেন নিজদের সন্তানদেরকে মাদকদ্রব্যের ক্ষতি সম্পর্কে উত্তম প্রশিক্ষণ দান করেন। সেই সাথে সতর্ক থাকেন, যাতে তাদের মধ্যে কোনো অবস্থাতেই এ কুঅভ্যাস গড়ে না ওঠে। অসৎ ও দুশ্চরিত্র ছেলেদের সাথে যেন তারা মিশতে না পারে সেদিকেও তাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। সর্বোপরি সন্তানদেরকে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে মাদকাসক্তি সম্পর্কে ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে সচেতন করতে হবে।

শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব: মাদকাসক্তি রোধে শিক্ষক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। শিক্ষকদের ধ্যান-ধারণা, আচার-আচরণ, চিন্তা-চেতনা, নির্দেশনা-উপদেশ এবং অভ্যাসের একটি কার্যকরী প্রভাব ছাত্রদের ওপর পড়ে। শিক্ষকগণ যদি ছাত্রদের মধ্যে এ বদভ্যাস গড়ে উঠার ব্যাপারে সতর্ক থাকেন এবং এ মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে প্রয়োজনীয় নির্দেশ ও উপদেশ দিতে থাকেন, তাহলে আসা করা যায় ছাত্ররা এ পথে পা বাড়াবে না।

সমাজ নেতাদের কর্তব্য: মাদকাসক্তি ও মাদকদ্রব্যের প্রসার রোধকল্পে সমাজের নেতাদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। কোনো মহল্লার সর্দার বা সমাজনেতা যদি মাদকাসক্তির প্রসার রোধে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যান, তাহলে সে মহল্লা বা সমাজে কখনো মাদকাসক্তির প্রসার ঘটতে পারে না।

আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হচ্ছে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তথা সরকারের। সরকারের প্রধান দায়িত্ব দেশে আইন-শৃংখলা রক্ষা করা এবং অপরাধপ্রবণতা দমন করতঃ ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা। সরকার যদি মাদকের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেন এবং শক্তহাতে তা দমনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তাহলে দেশ মাদকমুক্ত হতে বেশি দিন সময় লাগবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, যেহেতু নেশা করার মধ্যে কুফল ছাড়া কোনো সুফল নেই। নেশা মানেই সর্বনাশ। তাই আসুন, আমরা সবাই মিলে নির্মল-নিষ্কলুষ নেশামুক্ত পৃথিবী গড়ে তুলি। সেজন্য ঐক্যবদ্ধভাবে মাদকদ্রব্যাদির ব্যবহার রোধ করে জাতীয় ও নৈতিক দায়িত্ব পালন করি। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে মাদকের অনিষ্টতা থেকে হিফাযত করুন এবং এ ব্যাপারে প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করার তাওফীন দিন। আমীন।

اللَهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنْ آلِ نَبِيِّكَ الطَّيِّبِيْنَ الطَّاهِرِيْنَ وَعَنْ أَزْوَاجِهِ أُمُّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَعَنْ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ.

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সকল প্রকার মাদকদ্রব্য থেকে হিফাযত করুন। আমাদের পরিবার-পরিজনকে হিফাযত করুন। সমগ্র মুসলিম উম্মাহকে হিফাযত করুন। পৃথিবীর সমগ্র মানুষকে হিফাযত করুন। মাদকের ছোবল থেকে আমাদের ছেলেসন্তানদেরকে হিফাযত করুন। আমাদের দেশ ও জাতিকে হিফাযত করুন।

হে আল্লাহ! আপনি মুসলিম উম্মাহর প্রতি রহমত বর্ষণ করুন। মুসলিম উম্মাহকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমাদের সকলকে আপনি আপনার রেযামন্দীর পথে পরিচালিত করুন। আমাদের বৈধ প্রয়োজনগুলো পূরণ করে দিন। আমাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিন। দারিদ্র্য থেকে হিফাযত করুন। কুফর, শিরক ও বিদাআত থেকে সকল মুসলমানকে হিফাযত করুন। আমাদের সবাইকে আপনার নবীর সুন্নতের অনুসরন করার তাওফীক দান করুন। আমাদের সকলকে সত্যিকার অর্থে ইসলামের ধারক ও বাহক বানান। আপনি আমাদের সকল গুনাহ মাফ করে দিন। আমীন, আমীন, আমীন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ