অসুস্থ ব্যক্তির পবিত্রতা অর্জন ও নামায আদায়ের নিয়ম

পাঠ সংক্ষেপ

মুমিনের উচিত, দুঃখ-কষ্টের সময় সবর করা, আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালায় খুশি থাকা এবং সবরকারীদের জন্য তিনি যে পুরস্কারের অঙ্গীকার করেছেন তা প্রাপ্তির আশা রাখা। নামায অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। গুরুত্বের সাথে নামায আদায়ের আদৌ কোনো বিকল্প নেই। তাই সময় মতো অবশ্যই আমাদেরকে নামায আদায়ে যত্নবান হতে হবে। মুমিনের উচিত, দুঃখ-কষ্টের সময় সবর করা, আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালায় খুশি থাকা এবং সবরকারীদের জন্য তিনি যে পুরস্কারের অঙ্গীকার করেছেন তা প্রাপ্তির আশা রাখা।

অসুস্থ ব্যক্তির পবিত্রতা অর্জন ও নামায আদায়ের নিয়ম

খুতবায় যা থাকবে :

১- সর্বাবস্থায় নামায ধরে রাখার গুরুত্ব ও তাগিদ,

২-আল্লাহর কর্তৃক বান্দাকে পরীক্ষায় ফেলার নিয়ম ও আল্লাহর কাছে পরিত্রাণর প্রার্থনা করা,

৩-অসুস্থ ব্যক্তিদের নামাযে অবহেলা সম্পর্কে সতর্ক করণ,

৪- চিকৎসক ও অন্যান্য যারা অসুস্থ্য ব্যক্তিদের সেবায় নিয়োজিত থাকে তাদের প্রতি দিকনির্দেশনা

প্রথম খুতবা

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، جَعَلَ الصَّلَاةَ كِتَاباً مَوْقُوْتاً وَأَمَرَنَا بِإِقَامَتِهَا وَالُمَحَافَظَةِ عَلَيْهَا عَلَى الدَّوَامِ، أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ فِيْ رُبُوْبِيَّتِهِ وَإِلهَيَّتِهِ وَصِفَاتِهِ وَأَسْمَائِهِ الْعِظَامِ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْدُ :

প্রিয় মুসলমান ভাইয়েরা! নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা মহাপ্রজ্ঞাময় এবং সর্বজ্ঞ। তিনি তাঁর বান্দাদেরকে কখনো সুখ দিয়ে আবার কখনো দুঃখ দিয়ে পরীক্ষা করেন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:

{ وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ حَتَّى نَعْلَمَ الْمُجَاهِدِينَ مِنْكُمْ وَالصَّابِرِينَ وَنَبْلُوَ أَخْبَارَكُم }

‘ আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি প্রকাশ করে দেই তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদকারী ও ধৈর্যশীল এবং আমি তোমাদের কথা কাজ পরীক্ষা করে নেব’ (সূরা মুহাম্মদ: ৩১)।

সুহাইব রুমি রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

( عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ )

‘ মুমিনের ব্যাপারটা বড়ই আশ্চর্যজনক! কেননা তার প্রতিটি অবস্থাই তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। আর এটা কেবল মুমিনের জন্যই নির্ধারিত, অন্য কারো জন্য নয়। মুমিনের কাছে সুখের কিছু এলে শুকরিয়া আদায় করে। আর এটা তার কল্যাণের কারণ। অনুরূপভাবে যখন কোনো দুঃখ তাকে স্পর্শ করে তখন সে ধৈর্যধারণ করে। আর এটাও তার কল্যাণের কারণ’ (মুসলিম)।

তাই মুমিনের উচিত, দুঃখ-কষ্টের সময় সবর করা, আল্লাহ তা‘আলার ফয়সালায় খুশি থাকা এবং সবরকারীদের জন্য তিনি যে পুরস্কারের অঙ্গীকার করেছেন তা প্রাপ্তির আশা রাখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

{ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ }

‘কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোনো হিসাব ছাড়াই’ (সূরা যুমার: ১০)।

তিনি অন্যত্র ইরশাদ করেন:

{وَبَشِّرْ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُوْلَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُوْلَئِكَ هُمْ الْمُهْتَدُونَ }

‘ আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়েতপ্রাপ্ত’ (সূরা বাকারা: ১৫৬-১৫৭)।

আবু সাঈদ ও আবু হুরাইরা রাযি. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন :

( مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أَذًى شَوْكَةٌ فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا سَيِّئَاتِهِ كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ وَرَقَهَا)

‘ কাঁটার ঘা অথবা এর অধিক কোনো কষ্ট মুমিনকে স্পর্শ করলে এর বিনিময়ে আল্লাহ তা‘আলা তার গুনাহ মাফ করে দেন বৃক্ষ যেভাবে তার পাতা ঝরিয়ে দেয় ঠিক সেইরূপ’ (বুখারী)।

প্রিয় উপস্থিতি! প্রতিটি মুসলমানের অবস্থা তো এমন হওয়া উচিত যে, কোনো মুসলমান কখনো দুঃখ-কষ্ট কামনা করবে না এবং তাতে পতিত হবার প্রত্যাশাও করবে না। কেননা সে জানে না, দুঃখ-কষ্ট এলে সবর করতে পারবে কি না। এ জন্যই তো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা আব্বাস রাযি.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে দু‘আ প্রার্থনা করলে তিনি বললেন চাচা! আল্লাহর কাছে সুস্থতা কামনা করুন। আব্বাস রাযি. বারবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে দু‘আর আবেদন করতে থাকলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনÑ ‘হে রাসূলুল্লাহর চাচা! আল্লাহর কাছে সুস্থতা কামনা করুন’ (বুখারী)।

এজন্যই একজন মুমিন সদাসর্বদা আল্লাহ তাআলার কাছে ক্ষমা ও রোগবালাই থেকে নিরাপত্তা প্রার্থনা করে। তবে কোনো বিপদাপদের সম্মুখীন হলে ধৈর্যধারন করে, খুশি থাকে এবং আল্লাহর কাছে তার প্রতিদান আশা করে।

প্রিয় ভাইয়েরা! আপনারা আপনাদের সুস্থতা ও শারীরিক শক্তিসামর্থের দিনগুলোতে যতবেশি পারেন, নেককাজ করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনে মনযোগী হোন। কেননা আপনারা যদি সুস্থাবস্থায় নেককাজ করে যান তাহলে অসুস্থাবস্থায় নেককাজ করতে অপারগ হয়ে পড়লেও আল্লাহ তা‘আলা আপনারা সুস্থাবস্থায় যেসব নেককাজ করতেন তার ছাওয়াব দিয়ে দিবেন। আবূ মূসা রাযি.

থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা সফর করে তখন আল্লাহ তা‘আলা তাকে সুস্থ ও মুকীম অবস্থার নেকআমলের (অনুপাতে) ছাওয়াব দান করেন (বুখারী, আবু দাউদ)।

সুপ্রিয় শ্রোতামন্ডলী! নামায অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। গুরুত্বের সাথে নামায আদায়ের আদৌ কোনো বিকল্প নেই। তাই সময় মতো অবশ্যই আমাদেরকে নামায আদায়ে যত্নবান হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:

{ إِنَّ الصَّلاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَوْقُوتًا }

‘ নিশ্চয় নামায মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরয’ (সূরা নেসা: ১০৩)।

এ কথার অর্থ হল, ফরয নামাযগুলোর ওয়াক্ত আল্লাহ তা‘আলা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের ব্যাখ্যা দিয়ে তা সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাই আমাদেরকে এ নির্দিষ্ট সময়গুলোতেই ফরয নামায আদায় করতে হবে। অন্য সময় আদায় করলে হবে না।

মুসলী­য়ানে কেরাম! একজন মুমিনের আখলাক ও বৈশিষ্ট্য তো এমনই হওয়া উচিত যে, সে নামাযের ব্যাপারে খুবই যতœবান হবে। নামাযের প্রতি অত্যধিক গুরুত্বারোপ করবে এবং যথাযথ নিয়মানুযায়ী নিয়মিত নামায আদায় করবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

{ الَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلاتِهِمْ دَائِمُونَ }

‘যারা তাদের সালাতের ক্ষেত্রে নিয়মিত’ (সূরা আল-মাআরিজ: ২৩)।

অন্যত্র তিনি বলেন:

{ وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلاتِهِمْ يُحَافِظُونَ، أُوْلَئِكَ فِي جَنَّاتٍ مُكْرَمُون }

‘আর যারা নিজদের নামাযে হিফাযত করে, তারাই জান্নাতসমূহে সম্মানিত হবে’ (সূরা মাআরিজ ৩৪-৩৫)।

মুহতারাম হাযেরীন! যখন কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন সে হয়ত মনে করে নেয় যে, সময়মতো তাকে নামায পড়তে হবে না। অথবা সুস্থ হওয়ার পর সকল নামায একসাথে পড়ে নিলেই চলবে। অথবা মনে করে, অসুস্থতা নামাযের যাবতীয় শর্ত ও ওয়াজিসমূহ পূর্ণ করার পথে বাধা। তাই যে কোনো প্রকারে নামায আদায় করে নিলেই চলবে। মোটকথা, নামাযের ব্যাপারে অজ্ঞতাই তাকে সময়মতো ও যথাযথভাবে নামায আদায় করতে বাধা দেয় অলসতা কিংবা অমনোযোগিতা নয়।

মুসল্লী ভাইয়েরা! আপনারা জানেন যে, নামায শুদ্ধ হওয়ার জন্য শরীর, কাপড় ও নামাযের স্থান যাবতীয় নাপাকী থেকে পবিত্র থাকা শর্ত।

তবে অনেক সময় অসুস্থ ব্যক্তি এসব ক্ষেত্রে পবিত্রতা অর্জন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে। সে পানি দ্বারা ইস্তেন্জা করতে এবং অজুর অঙ্গগুলো ধুইতে অপারগ হয়ে যায়। অবশ্য কেউ যদি অসুস্থাবস্থায় পানি ব্যবহার করে পবিত্রতা অর্জন করতে সক্ষম হয় কিংবা কেউ তাকে অযুর ব্যাপারে সহযোগিতা করে তবে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত। কিন্তু পানি না থাকা কিংবা পানি ব্যবহার করতে অক্ষম হওয়া অথবা পানি ব্যবহারে রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা থাকার কারণে কেউ যদি পানি দ্বারা অযু করতে সক্ষম না হয়, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য অযুর বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুমের ব্যবস্থা রেখেছেন।

ইরশাদ হয়েছে:

{ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ }

‘এবং যদি পানি না পাও তাহলে পবিত্র মাটিতে তায়াম্মুম কর। সুতরাং তোমাদের মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ কর’ (সূরা নিসা: ৪৩)।

তবে কারো অবস্থা যদি এমন হয় যে, পানি ব্যবহার করে অযুও করতে পারছে না, আবার তার কাছে এমন কিছুও নেই যদ্বারা সে তায়াম্মুম করবে, এমতাবস্থায় সে যেভাবে আছে সেভাবেই নামায পড়বে। ইরশাদ হয়েছে :

{ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ }

‘আর তিনি দীনের ব্যাপারে তোমাদের উপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি’ (সূরা আল-হজ্জ: ৭৮)।

মুহতারাম শ্রোতামণ্ডলী! যতক্ষণ পর্যন্ত হুঁশ-জ্ঞান ঠিক থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত একজন মুসলমানকে নামায আদায় করে যেতে হবে। যেভাবে নামায পড়তে সামর্থ্য হয় সে ভাবেই নামায পড়ে যেতে হবে। হুঁশ-জ্ঞান ঠিক থাকা অবস্থায় কোনো মুসলমান নামায আদায় থেকে অব্যাহতি পায় না। কেননা নামায আদায় ইসলামের রুকনসমূহের একটি অন্যতম রুকন। এটি কোনো ব্যক্তির মুমিন ও মুসলমান হওয়ার স্পষ্ট দলীলও বটে। শুধু তাই নয়, কোনো ব্যক্তির নামায আদায় করার দ্বারা এটাও বুঝা যায় যে, সে ইসলামকে সত্য বলে মেনে নিয়ে তাকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছে।

ঈমান আনার পর কোনো মুমিন ব্যক্তির সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ জিম্মাদারী হলো, পাঁচ ওয়াক্ত নামায সময়মতো আদায় করা। কেননা মুকীম ও মুসাফির অবস্থায়, নিরাপদ ও ভীতিকর অবস্থায়, সুস্থ ও অসুস্থ অবস্থায়Ñ এক কথায় যে কোনো অবস্থায় কারো উপর থেকে নামায আদায় করার দায়িত্ব রহিত হয় না।

প্রিয়নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও অসুস্থ অবস্থায় দাঁড়াতে অক্ষম হলে বসে বসে নামায আদায় করেছেন। আনাস রাযি. বলেন, একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোড়া থেকে নীচে পতিত হয়ে আঘাতপ্রাপ্ত হন। তখন তিনি বসে বসে নামায আদায় করতেন (বুখারী)।

বেরাদারানে ইসলাম! খুব ভালো করে মনে রাখবেন যে, আপনি যখন রোগাক্রান্ত হলেও নামায আপনাকে সময়মতো গুরুত্ব দিয়ে পড়তেই হবে। সেই সাথে একথাও মনে রাখবেন যে, আল্লাহ তা‘আলা বান্দার উপর সাধ্যাতিত বোঝা চাপিয়ে দেন না। যেমন আল্লাহ তা‘আলা তার নবীর গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:

{ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالأَغْلالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِم }

‘আর সে তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল-যা তাদের ওপরে ছিল- অপসারণ করে’ (সূরা আরাফ: ১৫৭)।

তাই আপনি ফরয নামায দাঁড়িয়েই পড়ুন। কেননা দাঁড়িয়ে নামায পড়া নামাযের একটি অন্যতম রুকন। হ্যাঁ, যদি প্রয়োজন বোধ করেন তাহলে দাঁড়ানো অবস্থায় কোনো দেয়াল কিংবা খুঁটিতে ঠেস দিন। তথাপি সামান্য কারণেই বসে বসে নামায পড়বেন না।

অবশ্য আপনি যদি দাঁড়িয়ে নামায পড়তে একেবারেই অপারগ হন কিংবা দাঁড়িয়ে নামায পড়া আপনার জন্য খুব বেশি কষ্টকর হয় তাহলে আপনি বসে নামায পড়ুন। যদি বসতে অপারগ হন তাহলে শুয়ে একদিকে কাত হয়ে নামায আদায় করুন। যদি তাও না পারেন তাহলে চিৎ হয়ে শুয়ে আদায় করুন।

ইমরান ইবনে হুসাইন রাযি. বলেন, আমার অর্শ রোগ ছিল। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি বললেন, ‘তুমি দাঁড়িয়ে নামায পড়বে। যদি দাঁড়াতে সক্ষম না হও তাহলে বসে নামায পড়বে। যদি তাও না পার তবে কাত হয়ে শুয়ে নামায আদায় করবে’ (বুখারী, মুসলিম)।

ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত এক হাদীসে আছে, একদা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোনো এক অসুস্থ সাহাবীকে দেখতে গেলেন। সেখানে যাওয়ার পর তিনি দেখলেন, ঐ অসুস্থ সাহাবী বালিশের উপর (সিজদা দিয়ে) নামায আদায় করছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বালিশটি নিয়ে দূরে ফেলে দিলেন। অতঃপর ঐ সাহাবী সিজদা দেওয়ার জন্য একটি কাঠের ঢাল নিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটিও নিয়ে দূরে নিক্ষেপ করলেন এবং বললেন, যদি তুমি পার তাহলে জমিনেই সিজদা দাও। আর জমিনে সিজদা দিয়ে নামায পড়তে না পারলে ইশারা করে নামায পড়ো। আর ইশারা করে নামায পড়ার সময় সিজদা আদায়কালে রুকুর চাইতে একটু বেশি পরিমাণে ঝুঁকবে (বাইহাকী, আলবানী হাদীসটি হাসান বলেছেন)।

অর্থাৎ, আবশ্যক হলো, সময়মতো নামায আদায় করা। যদিও তা শুয়ে শুয়ে ইশারা দিয়েই আদায় করা হোক না কেন। এ ক্ষেত্রে মূল বিষয় হল হুঁশ-জ্ঞান ঠিক থাকা। হৃদয়ের অনুভূতি সজাগ থাকা।

অতএব হে মুসলিম ভাই! আপনি আপনার নামায দাঁড়িয়েই পড়–ন। যদি পারেন তাহলে রুকুও দাঁড়িয়ে করুন। যদি দাঁড়িয়ে রুকু করা আপনার জন্য কষ্টকর হয় তাহলে আপনি বসে ইশারা করে রুকু আদায় করুন। অর্থাৎ আপনি এখন নিয়ত করুন যে, আপনি রুকু বা সিজদা করছেন। আর সিজদার সময় রুকুর চাইতে একটু বেশি মাথা ঝুঁকান। যাতে রুকুটি সিজদা থেকে আলাদা হয়।

যদি আপনি রুকু-সিজদার সময় মাথা দিয়ে ইশারা করতেও অক্ষম হন তাহলে চোখ দিয়ে ইশারা করবেন। অবশ্য এ অবস্থায়ও রুকুর সময় অল্প এবং সিজদার সময় বেশি ইশারা করবেন।

কোনো কোনো রোগীকে দেখা যায়, তারা রোগাক্রান্ত অবস্থায় আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করেন। এরূপ করা সঠিক নয়। কেননা কুরআন ও হাদীসের কোনো স্থানে এমন কথা নেই। এমনকি কোনো আলেমও একথা বলেননি।

মুসল্লিয়ানে কেরাম! সবশেষে বলতে চাই, নামাযকে আল্লাহ তা‘আলা যুদ্ধ চলাকালে শত্র“র সাথে মোকাবেলা করা অবস্থায়ও আবশ্যক করেছেন, আমরা নিশ্চিন্ত ও নির্ভাবনায় থাকা অবস্থায় সেই নামাযের হুকুম আমাদের জন্য কিরূপ হবে তা একটু চিন্তা করে বুঝে নিন।

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن ِالْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر ِالحْكِيْمِ، أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو َالْغَفُور ُالرَّحِيْمْ .

অসুস্থ ব্যক্তির পবিত্রতা অর্জন ও নামায আদায়ের নিয়ম

দ্বিতীয় খুতবা

الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ سَهَّلَ لِعِبَادِهِ طَرِيْقَ الْعِبَادَةِ وَيَسَّرَهُ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ شَهَادَةً تُؤَمِّنُ مِنْ قَالَهَا وَعَمِلَ بِهَا مِنْ هَوْلِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ السَّادَةِ الْغُرَرِ. وَسَلَّمَ تَسْلِيْماً كَثِيْرَاً، أَمَّا بَعْدُ :

প্রিয় মুসল্লিয়ান! নামায সহীহ হওয়ার জন্য কেবলামুখী হওয়া শর্ত। এ ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। তবে অসুস্থ ব্যক্তি যদি কেবলামুখী হতে সক্ষম না হয় কিংবা তার খাট ও বিছানা যদি কিবলামুখী অবস্থায় না থাকে এবং তা পরিবর্তন করাও সম্ভব না হয় তাহলে যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় থেকেই সে নামায পড়বে।

প্রিয় ভাইয়েরা! কোনো কোনো সময় কোনো কোনো রোগী এমন সমস্যার সম্মুখীন হয় যে, প্রয়োজনের সময় সে কোনো লোক কাছে পায় না, যে তাকে অযু করতে সাহায্য করবে। অথবা কখনো এমন হয় যে, তার কাপড়-চোপড় ও বিছানা নাপাক হয়ে গেছে অথচ সে নিজে তা পরিস্কার করতে পারছে না। এদিকে নামাযের সময়ও চলে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় সে এভাবেই নামায আদায় করে নিবে।

যদি কারো ক্ষতের মধ্যে রক্ত ও পূঁজ দেখা যায় তাহলে সে তা নিয়েই নামায পড়ে নিবে।

মিসওয়ার ইবনে মাখরামা রাযি. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, যে রাতে ওমর রাযি. বর্শা দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন সে রাতে তিনি তার নিকট গিয়ে তাকে ফজরের নামায আদায় করার জন্য জাগিয়ে দিলেন। তখন ওমর রাযি. বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই আমি নামায পড়ব। কেননা যে ব্যক্তি নামায পড়ে না ইসলামে তার কোনো অংশ নেই্। এ বলে তিনি নামায আদায় করলেন। তখন তার ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছিল (এই হাদীসের বর্ণনাকারী ইমাম মালেক রাহ.)।

বস্তুত বিশ্বাসী ও সজাগ হৃদয়ের অবস্থা এমনই হয়ে থাকে। কঠিন অসুস্থতাও তাদেরকে নামায আদায় ও তার প্রতি গুরুত্বারোপ করা থেকে বিরত রাখতে পারে না।

প্রিয় মুসল্লিয়ান! যে ব্যাক্তি বাড়ীতে বা হাসপাতালে রোগীর সেবা করে, তার উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং নামাযের সময় রোগীকে নামাযের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়া। আর নামায আদায়ে তাকে সাহায্য করা। বিশেষ করে আপনাদের পিতা-মাতা যদি অসুস্থ হয়, তাহলে আপনাদের উচিত তাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করা এবং নামাযের মতো এই গুরত্বপূর্ণ নেকআমল সম্পাদনে তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা। তাদেরকে নামাযের দাওয়াত দেয়া এবং অসুস্থ অবস্থায় নামায পড়া তাদের জন্য কঠিন মনে হলে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তা তাদের জন্য সহজ করে দেয়া।

ডাক্তারগণ তাদের চিকিৎসা ও সময়ানুবর্তিতার প্রতি বেশ গুরুত্ব দেন। তারা সকাল সন্ধ্যায় নির্ধারিত সময়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন। এটা ডাক্তারদের একটি ভালো অভ্যাস। ডাক্তারদের সময়ানুবর্তিতার বিষয়টি খেয়াল করে রোগী এবং রোগীর সেবাকারীদেরও উচিত, সময়মতো নামায আদায়ের প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং একথা ভুলে না যাওয়া যে, নামায একটি অতি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। নামায হলো আত্মার খোরাক।

প্রিয় শ্রোতাবৃন্দ! আপনারা নামাযের প্রতি গুরুত্ব দিন এবং এর ব্যাপারে যত্নশীল হোন। সব সময় লক্ষ্য রাখুন, যাতে মওত পর্যন্ত এক ওয়াক্ত নামাযও কাযা না হয়। যদি আপনারা এমনটি করতে পারেন তাহলে আপনারাই হবেন জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী। আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন:

{وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ أُوْلَئِكَ هُمْ الْوَارِثُونَ الَّذِينَ يَرِثُونَ الْفِرْدَوْسَ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ }

আর যারা নিজদের সালাতসমূহ হিফাযত করে। তারাই হবে ওয়ারিস। যারা ফিরদাউসের অধিকারী হবে। তারা সেখানে স্থায়ী হবে’ (সূরা মুমিনুন: ৯-১১)।

আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন:

{فَإِنْ خِفْتُمْ فَرِجَالاً أَوْ رُكْبَانًا }

‘কিন্তু যদি তোমরা ভয় কর, তবে হেঁটে কিংবা আরোহণ করে (আদায় করে নাও)’ (সূরা বাকারা: ২৩৯)।

উলামায়ে কিরাম বলেন, এ আয়াতটি এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, শত্র“র ভয়কে অপারগতার কারণ বানিয়ে নামায পরিত্যাগ করা যাবে না বরং ঐ অবস্থায় ইশারা করে হলেও নামায আদায় করতে হবে। চাই কেবলামুখী হওয়া সম্ভব হোক বা না হোক।

দু‘আ করি, আল্লাহ তা‘আলা যেন আমাকে এবং আপনাদের সবাইকে নামাযের ব্যাপারে মৃত্যু পর্যন্ত যত্মবান থাকার তাওফীক দেন। নিশ্চয় তিনি সর্বশক্তিমান।

اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَىَ آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنْ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنَ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ .

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে নিয়মিত নামায আদায়ের তাওফীক দান করুন। নামাযের সকল আহকাম-আদাব রক্ষা করে নামায কায়েম করার তাওফীক দান করুন। সুস্থতা-অসুস্থতা সকল অবস্থায় নামাযের পাবন্দ থাকার তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে সকল রোগ-বালাই থেকে পরিত্রাণ কামনা করছি, আফিয়ত প্রার্থনা করছি। আপনি আমাদেরকে সকল রোগ-বালাই থেকে রক্ষা করুন। আমাদের মধ্যে যারা অসুস্থ রয়েছে তাদেরকে শেফা দান করুন। তাদেরকে ধৈর্যধারণের তাওফীক দান করুন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله ِ: (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.