পাঠ সংক্ষেপ

ইসলামী শরীয়তে ইবাদত একটি ব্যাপক বিষয়, যা দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতের যাবতীয় কল্যাণকে শামিল করে। যার তাত্বিকতাকে ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করা যায়- ইবাদত বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ এমন কথা ও কাজ যা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন ও ভালবাসেন।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ مُعِزِّ مَنْ أَطَاعَهُ وَاتَّقَاهُ، وَمُذِلِّ مَنْ أَضَاعَ أَمْرَهُ وَعَصَاهُ، وَفَّقَ أَهْلَ طَاعَتِهِ لِمَا يُحِبُّهُ وَيَرْضَاهُ، أَحْمَدُهُ عَلَى جَزِيْلِ كَرَمِهِ وَمَا أَوْلَاهُ، وَأَشْكُرُهُ عَلَى آلَائِهِ الْجَسْيمَةِ وَمَا أَسْدَاهُ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ لَا رَبَّ سِوَاهُ، وَلَا نَعْبُدُ إِلَّا إِيَّاهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبِيَّنَا مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ خَيْرُ عَبْدٍ اجْتَبَاهُ، وَأَفْضَلُ رَسُوْلٍ اصْطَفَاهُ، اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَمَنْ كَانَ هَوَاهُ تَبَعاً لِهُدَاهُ، أَمَّا بَعْدُ : فَاتَّقُوا اللهَ عِبَادَ اللهِ حَقَّ التَّقْوَىْ، وَعَظِّمُوا أَوَامِرَهُ وَاجْتَنِبُوْا نَوَاهِيْهِ، أَمَّا بَعْدُ :

মানব ও জিন সৃষ্টির রহস্য

সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ! আমাদের আজকের খুতবার বিষয় হচ্ছে, ইসলামে ইবাদত বলতে কী বুঝায় এবং কী তার উদ্দেশ্য। প্রাজ্ঞ উপস্থিতি, প্রজ্ঞার দাবি হল সকল কাজে লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য থাকা। উদ্দেশ্যবিহীন ও অনর্থক কাজ এড়িয়ে চলা। সে নীতিতে বিচার করলে অবশ্যই মানতে হবে, মহাপ্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলা কোনো কিছুই বিনা উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেননি। তাঁর সকল কর্মেই রয়েছে অপার হিকমত। সুতরাং এ মহাবিশ্ব ও তাতে বিদ্যমান কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীন নয়। কিছুই তিনি অযথা-অনর্থক সৃষ্টি করেননি। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন:

{ وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا بَاطِلًا ذَلِكَ ظَنُّ الَّذِينَ كَفَرُوا فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ كَفَرُوا مِنَ النَّارِ }

‘আর আসমান, জমিন এবং এ দুয়ের মধ্যে যা আছে তা আমি অনর্থক সৃষ্টি করিনি। এটা কাফেরদের ধারণা, সুতরাং কাফেরদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের দুর্ভোগ’ (সূরা সাদ: ২৭)।

জিন-ইনসানের সৃষ্টিও এ ধারার বাইরে নয়। বরং প্রজ্ঞাময় সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে যে এক মহান উদ্দেশ্যে এ ধরায় পাঠিয়েছেন সে সম্বন্ধে স্পষ্ট করে বলেন :

{ وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ. مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِ }

‘ আর আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে। আমি তাদের কাছে কোনো রিযক চাই না, আর আমি চাই না যে, তারা আমাকে খাবার দিবে’ (সূরা আয-যারিয়াত : ৫৬-৫৭)।

সুতরাং সৃষ্টির উদ্দেশ্য তাঁর ইবাদত করা এবং তাঁর আরোপিত নির্দেশ বাস্তবায়ন করা।

ইবাদতের অর্থ কি?

প্রিয় ভ্রাতৃবৃন্দ! ইবাদত একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। যার মূল হচ্ছে, দীন ও ধর্মকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা। যাবতীয় বন্দেগী হবে কেবলমাত্র তাঁরই নিমিত্তে। মন নিবিষ্ট থাকবে তাঁরই প্রতি ভয়, আগ্রহ ও ভালবাসায়। সকল ইবাদত উদযাপিত হবে তাঁরই জন্য, আপনার নামাজ তাঁরই জন্য, রোযা তাঁরই জন্য, দোয়া তাঁরই নিকট, আপনি বাধিত হবেন তাঁরই কাছে, আপনার ভয় তাঁরই জন্য, ভালবাসা-কামনা-বাসনা, নির্ভরতা-তাওয়াক্কুল সব তাঁরই ওপর। কারণ

{ ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّ مَا يَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ هُوَ الْبَاطِلُ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْعَلِيُّ الْكَبِيرُ }

‘ আর এটা এজন্য যে, নিশ্চয় আল্লাহই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে, আবশ্যই তা বাতিল। আর নিশ্চয় আল্লাহ তো সমুচ্চ, সুমহান’ (সূরা হজ্জ : ৬২)।

হে মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! ইসলামী শরীয়তে ইবাদত একটি ব্যাপক বিষয়, যা দুনিয়া-আখেরাত উভয় জগতের যাবতীয় কল্যাণকে শামিল করে। যার তাত্বিকতাকে ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করা যায়-

هِيَ اسْمٌ جَامِعٌ لِكُلِّ مَا يُحِبُّهُ اللهُ وَيَرْضَاهُ مِنْ الْأَقْوَالِ وَالْأَعْمَالِ الظَّاهِرَةِ وَالْبَاطِنَةِ

অর্থাৎ, ইবাদত বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ এমন কথা ও কাজ যা মহান আল্লাহ পছন্দ করেন ও ভালবাসেন।

প্রতিটি মুসলিমকে যথার্থভাবেই জানা উচিত যে, সে নিছক আল্লাহর বান্দা ও গোলাম। সুতরাং সে দাসত্বের পরিচয় কিভাবে তুলে ধরা যায়, তার সার্বিক তৎপরতা ও প্রচেষ্টা কেবল এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে।

ইবাদতের শ্রেণীবিভাগ

সম্মানিত শ্রোতামণ্ডলী! মহান আল্লাহর অপার করুণা, তিনি মানবজাতির জন্য বিভিন্ন ইবাদতের অনুমোদন দিয়েছেন। কিছু ইবাদত দিয়েছেন যা মন ও অনুভূতি দিয়ে পালন করতে হয়, যাকে ইবাদতে কলবিয়া বলে। সবকিছু একেবারে আল্লাহর নিমিত্তে পালন করার মানসিক সঙ্কল্প, তাঁর সন্তুষ্টি ও কৃপা লাভের আশা পোষণ করা এসবই কলবী ইবাদত। কিছু আছে শারীরিক ইবাদত, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে যা সম্পাদন করতে হয়, যাকে ইবাদতে বাদানিয়্যা বলে। দৈনন্দিন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, রমযানের সিয়াম পালন এরই অন্তর্ভুক্ত। আরো আছে অর্থ-সম্পদ কেন্দ্রিক ইবাদত, যাকে ইবাদতে মালিয়া বলে। সম্পদের মাধ্যমে যা আদায় করতে হয়। যেমন যাকাত, উশর ও সাদকা-ফিতরা ইত্যাদি যা একজন বান্দা স্বীয় প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আদায় করে থাকে। আবার কিছু ইবাদত আছে যা সম্পাদন করতে অর্থ ও শরীর উভয়ের প্রয়োজন হয়। যেমন হজ্ব, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ইত্যাদি।

মহান আল্লাহর আরো দয়া ও কৃপা যে, তিনি যেমনি করে ফরয ইবাদতের অনুমোদন দিয়েছেন তেমনি প্রতিটি ফরযের পাশাপাশি অনুমোদন দিয়েছেন নফলেরও। নফল সালাত, নফল সওম, নফল যাকাত, নফল হজ্ব ও উমরা। এ সবই আমাদের ঈমানের মজবুতির জন্য, নেক-আমলের আধিক্য ও দারাজাত বুলন্দির সুযোগ সৃষ্টির জন্য। সবই মহান রবের অন্তহীন কৃপা। অপার রহমত ও দয়া। তাঁর গুণগান শেষ করা যাবে না, তিনি তেমনই যেমন বর্ণনা করেছেন তিনি নিজে।

ইবাদত কবুল হওয়ার শর্ত

সম্মানিত হাযেরীনে মজলিস! মহান আল্লাহর বিশালতা ও মাহাত্ম পরিমাপ করা সৃষ্টির পক্ষে অসম্ভব। কারণ সৃষ্টির জ্ঞান সীমিত, তার উপলব্ধি-অনুভূতি সবই সীমিত। এই সীমিত জ্ঞান ও অনুভূতি দ্বারা মহান ও অসীম আল্লাহকে আয়ত্ব করা কিছুতেই সম্ভব নয়। তাই বান্দার একমাত্র কাজ হলো তাঁর হুকুম তামিল করা। কোনো দিকে না তাকিয়ে সর্বান্তকরণে তাঁকে মান্য করা। তাঁর পক্ষ থেকে অনুমোদিত ও নির্দেশিত ইবাদতগুলো পালন করে যাওয়া। মানুষের পক্ষে যেহেতু তাঁর বড়ত্বের সীমা সম্বন্ধে জানা অসম্ভব তাই তাঁর সম্মান ও শানের সাথে প্রযোজ্য ইবাদত কী হতে পারে সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে আসাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। সুতরাং সে নিজ হতে কোনো ইবাদত আবিষ্কারের যোগ্য নয়। তার দাসত্বের বহিঃপ্রকাশ কেবল মহামহীমের নির্দেশ নিঃশর্তভাবে পালন করার মধ্যেই সীমিত। আর সে নির্দেশ পালনই হচ্ছে মূলতঃ ইবাদত। মানুষ যেমনিভাবে ইবাদত নিজ হতে আবিষ্কার করতে পারে না যৌক্তিক কারণে, সেই একই কারণে সে ইবাদত পালনের পদ্ধতি কি হবে সেটি নিরূপণ করাও তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এ ক্ষেত্রেও তাকে মহান আল্লাহর দেয়া পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হবে, যাতে ইবাদত আদায়ের পদ্ধতিও মহান আল্লাহর শানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়।

সুতরাং আমাদেরকে বুঝতে হবে, মহান আল্লাহ প্রদত্ত এ শরীয়ত পরিপূর্ণ। তাতে সংযোজন ও বিয়োজনের কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ বলেন :

{ الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا }

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম আর তোমাদের জন্য দীন হিসাবে পছন্দ করলাম ইসলামকে’ (সূরা আল মায়েদা : ৩)।

আল্লাহ প্রদত্ত যাবতীয় ইবাদত কবুল হবার জন্য মৌলিক শর্ত দুটি:

এক. ইবাদত ও আমল সম্পাদিত হতে হবে কেবলমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। রিয়া- লৌকিকতা ও খ্যাতি অর্জনের মোহমুক্ত হতে হবে। ইরশাদ হচ্ছে :

{ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ }

‘আর তাদেরকে কেবল এই নির্দেশ দেয়া হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে’ (সূরা আল-বায়্যিনাহ : ৫)।

দুই. ইবাদত আদায় হতে হবে সঠিক পদ্ধতিতে- আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নত অনুযায়ী। অনথ্যায় তা হবে কেবলই নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

{ فَإِنْ لَمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنَ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِنَ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ }

‘ অতঃপর তারা যদি তোমার আহ্বানে সাড়া না দেয়, তাহলে জেনে রাখ, তারা তো নিজদের খেয়াল খুশির অনুসরণ করে। আর আল্লাহর দিকনির্দেশনা ছাড়া যে নিজের খেয়াল খুশির অনুসরণ করে তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে? নিশ্চয় আল্লাহ জালিম কওমকে হিদায়েত করেন না’ (সূরা আল কাসাস: ৫০)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :

( وَإِيَّاكُمْ وَ مُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ، فَإِنَّ كُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ )

‘তোমরা (অপ্রমাণিত) নতুন নতুন বিষয়াদি হতে সতর্ক থাকবে, কারণ প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী’ (আবূ দাউদ ও তিরমিযী, তিনি হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলে মন্তব্য করেছেন)।

অভ্যাসগত-মুবাহ কাজও সওয়াবের নিয়তে সম্পাদন করলে নেক-আমলে পরিণত হয়

ইসলামপ্রেমী প্রিয় ভাইয়েরা আমার! প্রাত্যহিক জীবনে নানা প্রয়োজনে আমাদেরকে বিভিন্ন কাজ করতে হয়। আঞ্জাম দিতে হয় নানা ক্ষেত্রে নানা দায়িত্ব। সাংসারিক জীবনে পিতা-মাতার খেদমত, স্ত্রী-সন্তানদের ভরণ-পোষণ ইত্যাদি। সামাজিক জীবনে পাড়া-পড়শীর খোঁজ-খবর, দরিদ্র-অসহায়দের সমস্যা সমাধান, আর্ত মানবতার সেবা। রাষ্ট্রীয় জীবনে একটি সুন্দর দেশ গঠন কল্পে নানাবিধ ভূমিকা রাখতে হয় আমাদেরকে। তদ্রƒপ ব্যক্তি জীবনে নিজ প্রয়োজনে অনেক কাজই আমাদের করতে হয়। এসব প্রয়োজনীয় কাজ নিয়তের মাধ্যমে আমরা সওয়াব ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের কাজে পরিণত করতে পারি। পারি আমাদের পূন্যের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এ বিষয়ে সুন্দর দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন একজন মুসলিম পিতা-মাতার খেদমতের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতে পারে, হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে :

( عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ العَاصِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى نَبِيِّ اللَّهِ صَلَّىَ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاسْتَأْذَنَهُ فِي الْجِهَادِ، فَقَالَ : أَحَيٌّ وَالِدَاكَ ؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فِيْهِمَا فَجَاهِدْ )

‘ আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাদিয়াল¬াহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যাক্তি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে জিহাদে অংশগ্রহণের অনুমতি প্রার্থনা করল, নবীজী সা. তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার পিতা-মাতা কি জীবিত আছেন’? সে বলল, ‘হ্যাঁ’। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি গিয়ে তাদের পেছনে জিহাদ কর’ (অর্থাৎ, তাদের খেদমতে চেষ্টা-শ্রম ব্যয় কর)’ (বুখারী)।

প্রিয় শ্রোতামণ্ডলী! লক্ষ্য করে দেখুন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে পিতা-মাতার খেদমতকে ময়দানী জিহাদের সাথে তুলনা করেছেন। সুতরাং কেউ খাঁটি নিয়তে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মাতা-পিতার খেদমত করলে কাফিরদের বিরুদ্ধে জিহাদের ছাওয়াব পাবে। প্রিয় ভাইয়েরা, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার চেষ্টা করা আল্লাহর ইবাদত, কারণ এর মাধ্যমে আপনি আল্লাহর নির্দেশ পালন করছেন। আল্লাহ বলেন :

{ وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيبًا }

‘আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যার মাধ্যমে তোমরা একে অপরের কাছে চাও। আর ভয় কর রক্ত-সম্পর্কিত আত্মীয়ের ব্যাপারে’ (সূরা আন নিসা : ১)।

অনুরূপভাবে সন্তানাদি ও সাংসারিক প্রয়োজনে ব্যয় করাও আল্লাহর ইবাদত এবং ছাওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাদ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রাযি.-কে লক্ষ্য করে বলেন :

( إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِيْ بِهَا وَجْهَ اللَّهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِي فَمِ امْرَأَتِكَ.)

‘ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তুমি যে ব্যয়ই করবে, তাতে ছাওয়াব প্রাপ্ত হবে। এমনকি যে খাবার তুমি নিজ স্ত্রীর মুখে তুলে দেবে, তাতেও’ (বুখারী)।

একইভাবে আপনার ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি, বিবাহ-শাদি, চারিত্রিক নিষ্কলুষতা বজায় রাখা, দৃষ্টি অবনত রাখা সব কিছুই ইবাদত। কারণ এসবের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নির্দেশ পালন করা হয়।

সুতরাং সম্মানিত ভাইসব! আমাদের ইবাদত কেবলমাত্র কিছু আরকান-আহকাম বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামগ্রিক বিচারে আবশ্যিক বিষয়াদি পালন করা এবং নিষেধাবলী পরিহার করাই হলো ইবাদত।

সম্মনিত ভ্রাতৃবৃন্দ! যখনই আপনি আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় অনুগত চিত্তে নিষিদ্ধ কাজ পরিহার করবেন তখনই সেটি ইবাদত হিসাবে গৃহীত হবে। এ কারণেই জনৈক মনীষী তাকওয়ার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন :

( أَنْ تَعْمَلَ بِطَاعَةِ اللهِ، عَلَى نُوُرٍ مِنَ اللهِ، تَرْجُو بِذَلِكَ ثَوَابَ اللهِ، وَأَنْ تَتْرُكَ مَعْصِيَةَ اللهِ، عَلَى نُوُرٍ مِنَ اللهِ، تَخَافُ عِقَابَ اللهِ )

‘ তাকওয়া হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারের আশায় তাঁর নির্দেশ ও অনুমোদন সাপেক্ষে তাঁর আনুগত্য করা এবং আল্লাহর শাস্তির ভয়ে তাঁর নির্দেশনার আলোকে অপরাধ ও অবাধ্যতা পরিত্যাগ করা’।

সুতরাং একজন মুসলিম তার যাবতীয় কাজ কেবলমাত্র নিয়তের মাধ্যমে ইবাদতে পরিণত করতে পারে। মানবতার কল্যাণে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় যে কাজই সে করবে সেটিই ইবাদত বলে গণ্য হবে। দেখুন মানবতার কল্যাণে সামন্য একটু ভূমিকা রাখলে আল্লাহ তাআলা কত অপরিসীম পুরস্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :

( مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْساً وَلَا يَزْرَعُ زَرْعاً فَيَأْكُلُ مِنْهُ إِنْسَانٌ أَوْ طَائِرٌ إِلَّا كَانَ لِغارِسِهِ الْأَوَّلِ أَجْرٌ )

‘ কোনো মুসলিম বৃক্ষ রোপন করলে কিংবা ক্ষেত-কৃষি করলে, তা থেকে যদি কোনো মানুষ কিংবা পাখি কিছু খায় তবে তার বিনিময়ে প্রথম রোপনকারীর জন্য ছাওয়াব রয়েছে’ (বুখারী ও মুসলিম)।

সুবহানাল্লাহ! প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা, রাব্বুল আলামীন কত সুন্দর ব্যবস্থা রেখেছেন আমাদের জন্য। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক কিছু অপসারণ করা থেকে নিয়ে রাষ্ট্রীয় কাজে ভূমিকা রাখা আর রাতে বিনিদ্র থেকে সেজদারত থাকা সবই ইবাদত। বড়ই সৌভাগ্যবান তারা, যারা তাদের সময়কে এমন মূল্যবান কাজে অতিবাহিত করতে সক্ষম হয়।

ইবাদত হতে হবে পূর্ণ আন্তরিকতায় ও একাগ্রচিত্তে এবং তা পালন করতে হবে সর্বোচ্চ সুন্দর পদ্ধতিতে

বিজ্ঞ মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনের মধ্যেই সৃষ্টির কল্যণ ও কামিয়াবি নিহিত। তাই সুবিবেচনার দাবী হল, সে ইবাদত নিরবচ্ছিন্নভাবে করে যাওয়া, কখনো বিরক্ত ও নিরাসক্ত না হওয়া। মহান আল্লাহ তাআলা বলেন :

( وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ )

‘আর তুমি মৃত্যু আসা অবধি আপন রবের ইবাদত করো’(সূরা আল হিজর: ৯৯)।

ইবাদতেই আমাদের কল্যাণ, এটিই কামিয়াবির একমাত্র রাস্তা, তাই তা আদায় করতে হবে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সাথে, সর্বাধিক সুন্দর পদ্ধতিতে। শুধুমাত্র দায়িত্ব পালন ও রুটিনের অনুসরণই যাতে বিবেচ্য না হয়। সে ধরণের ইবাদতের মাধ্যমেই কেবল মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জিত হবে। প্রশান্ত হবে হৃদয়-মন। শীতল হবে চক্ষু। উদ্বেলিত হবে অন্তর তৃপ্তি ও আনন্দে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রিয় সহচর বিলাল রা. কে লক্ষ্য করে বলেন :

( أَرِحْنَا بِهَا يَا بِلالُ الصَّلاةَ )

‘(বিলাল!) সালাতের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রশান্তি দাও’ (তাবারানী, সহীহ)।

আরও বলছেন :

( جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِيْ فِيْ الصَّلَاةِ )

‘আমাদের চোখের শীতলতা (প্রশান্তি) রাখা হয়েছে নামাজের মধ্যে’ (নাসাঈ, হাসান-সহীহ)।

অর্থাৎ সালাতের মাধ্যমে আমার মন প্রশান্তি লাভ করে, চোখ জুড়িয়ে যায়।

ইবাদতে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন নিষিদ্ধ

প্রাজ্ঞ উপস্থিতি, ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি যে, মহান আল্লাহর ইবাদতেই বান্দার যাবতীয় কল্যাণ নিহিত। বান্দার সফলতা ও স্বার্থকতা তাঁর আনুগত্যের মধ্যেই। তবে তা হতে হবে সহনীয় মাত্রায়। সামর্থ্যরে সাথে সঙ্গতি রেখে। ইবাদতে আগ্রহ থাকা আবশ্যক। তাই চাপ নিয়ে ইবাদত করতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরুৎসাহিত করেছেন কঠোরভাবে। তিনি বলেন :

(إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ الْغُلُوُّ)

‘তোমরা অতিরঞ্জন ও বাড়াবাড়ি থেকে সতর্ক থাকো, কেননা বাড়াবাড়ি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করে দিয়েছে’ (আহমদ, তিরমিযী ও ইবন মাজাহ)।

বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জন কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না বরং এটি একটি ধ্বংসাত্মক প্রবণতা। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবারবার উম্মতকে তা থেকে সতর্ক করেছেন। এক হাদীসে এসেছে :

(وَعَنِ ابْنٍ مَسْعُوْدٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّىَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ هَلَكَ الْمُتَنَطِّعُوُنَ قَالَهَا ثَلَاثَا)

আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, অযথা কঠোরতা অবলম্বনকারীরা ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি কথাটি তিন বার বলেছেন’ (মুসলিম)।

সম্মানিত হাযেরীন! সাহাবী আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রাযি. সম্বন্ধে আপনারা নিশ্চয় জানেন, তিনি সারা দিন রোযা রাখতেন এবং সারা রাত ইবাদতে অতিবাহিত করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে বললেন:

‘আমাকে অবহিত করা হয়েছে যে, তুমি নাকি দিনভর রোযা রাখো আর রাতভর ইবাদতে ব্যস্ত থাক? আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তখন নবীজী বললেন, তুমি এমনটি করবে না। রোযা রাখবে আবার রাখা ছেড়ে দেবে অনুরূপভাবে রাতে ঘুমাবে আবার জেগে ইবাদত করবে। কারণ তোমার ওপর তোমার শরীরের হক আছে, তোমার ওপর তোমার দুই চোখের হক আছে, তোমার ওপর তোমার স্ত্রীর হক আছে, তোমার ওপর তোমার সাক্ষাতপ্রার্থীদের হক আছে। তোমার জন্য বরং মাসে তিন দিনের রোযাই যথেষ্ট। কারণ একটি নেক-আমলের বিনিময়ে তোমাকে দশগুণ ছাওয়াব দেয়া হবে। আর তখন এটা সারা বছর রোযা রাখার সমতুল্য হবে। আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি আরো সামর্থ্য রাখি। তিনি বললেন, তাহলে আল্লাহর নবী দাউদ আ.Ñএর মত রোযা রাখ। এর বেশি করতে যেও না। আমি বললাম দাউদ আ.-এর রোযা কেমন ছিল? তিনি বললেন, অর্ধ বছর। বৃদ্ধ বয়সে আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি. আফসোস করে বলতেন, হায়! আমি যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেয়া ছাড় গ্রহণ করতাম’ (বুখারী ও মুসলিম)।

সম্মানিত উপস্থিতি! ইবাদত নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী করা দরকার। ইবাদতের হক আদায় করে নিজের মনের প্রফুল¬তা বজায় রেখে যতটুকু করা যায় ততটুকুই উত্তম। তার অতিরিক্ত করলে তা হবে বাড়াবাড়ি, যা কখনোই শরীয়ত কারো কাছ থেকে চায় না। ইবাদতে বাড়াবাড়ি এক সময় বান্দাকে ইবাদতের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ও বিরক্ত করে তোলে।

প্রিয় মুসলিম ভ্রাতৃবৃন্দ! একদিন অনেক ইবাদত করা আর অন্য দিন মোটেও না করা, তারচেয়ে অধিক গ্রহণযোগ্য ও উত্তম হলো প্রতিদিন কিছু কিছু করা। ইবাদত তো অনেক, তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী প্রতিদিনই নিজ রবের ইবাদতে মশগুল থাকা। যেহেতু আনুগত্যই আল্লাহর চাহিদা তাই এ আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ প্রতিদিনই হবে, সেটিই বাঞ্ছনীয়। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর চাহিদা মোতাবেক ইবাদত করার তাওফীক দান করুন। তিনিই সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিকভাবে তাঁর ইবাদত পালনের তাওফীক দান করুন। আমীন।

أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ لِي وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوْهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الْرَّحِيْمُ

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ يَذْكُرُ مَنْ ذَكَرَهُ، وَيَزِيْدُ مَنَ شَكَرَهُ، وَيَتُوْبُ عَلَى مَنْ تَابَ إِلَيْهِ وَاسْتَغْفَرَهُ، وَيُعَذِّبُ مَنْ جَحَدَهُ وَكَفَرَ، أَحْمَدُهُ عَلَى سَابِغِ نِعَمِهِ وَأَسْأَلُهُ الْمَزِيدَ مِنْ فَضْلِهِ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ أَمَرَ الْمُؤْمِنِيْنَ بِتَقْوَاهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبِيَّنَا مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ أَفْضَلُ الذَّاكِرِيْنَ وَقُدْوَةَ الشَّاكِرِيْنَ، صَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعِيْنَ، أَمَّا بَعْدُ : فَاتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ التَّقْوَىْ، وَاسْتَمْسِكُوُا بِالْعُرْوَةِ الْوُثْقَى.

আল্লাহ তাআলার দাসত্বের মধ্যেই বান্দার প্রকৃত ইয্যত ও মর্যাদা

সম্মানিত মুসল্লীবৃন্দ! আল্লাহ তাআলার উবুদিয়ত তথা দাসত্ব করা প্রতিটি বান্দার অবশ্য করণীয়। এ দাসত্ব বান্দার মর্যাদার নিদর্শন, সম্মানের মুকুট। বরং বলা যায় পৃথিবীর সকল অর্জন ও সামগ্রীর মধ্যে সবচে’ মূল্যবান অর্জন এটি। তাই তো আমরা দেখতে পাই পৃথিবীর সর্বাধিক সম্মানিত ও সফল ব্যক্তিত্ব রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এই উবুদিয়তের গুণ উলে¬খ করেই সম্বোধন করা হলো। এটি একটি স্পষ্ট প্রমাণ যে বান্দার সকল অর্জনের মধ্যে আল্লাহর নিকট সর্বাধিক মর্যাদাপূর্ণ অর্জন হলো উবুদিয়তের গুণ অর্জন। ইসরা ও মিরাজ যেটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হবার অন্যতম অনুষঙ্গ, সেই গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ বিষয়টি বর্ণনার সময়ও পবিত্র কুরআনে দাসত্বের গুণটি উলে¬খ করা হয়েছে, ইরশাদ হয়েছে :

{ سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَى بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ لِنُرِيَهُ مِنْ آيَاتِنَا إِنَّه هُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ }

‘ পবিত্র মহান সে সত্তা, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতে নিয়ে গিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশেপাশে আমি বরকত দিয়েছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি। তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’ (সূরা আল ইসরা: ১)।

বিষয়টিকে বিবেচনায় আনলে অতি সহজে হৃদয়ঙ্গম করা যায় যে, উবুদিয়ত বান্দার সম্মানের মুকুট, শ্রেষ্ঠত্বের নিদর্শন। তাই সকল কথায় ও কাজে মহান আল্লাহর দাসত্বকে ধারণ করে নিজদের মর্যাদা বৃদ্ধির রাস্তায় অগ্রসর হওয়া উচিত। এতেই রয়েছে আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন জীবনের কল্যাণ ও শান্তি। মহান আল্লাহ তাকে সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন ও সম্মানজনক অভিধায় সম্ভাষণ করেছেন, আর তা হচ্ছে উবুদিয়ত তথা দাসত্বের সম্ভাষণ।

ইবাদত বিষয়ে একটি বিভ্রান্তি

সম্মানিত উপস্থিতি, ইবাদত বিষয়ক আলোচনা থেকে আশা করি আমরা এর মর্ম সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা পেয়েছি যে, জীবনের সার্বিক পর্বে আল্লাহর রেযামন্দি ও সন্তুষ্টির জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ-অনুকরণে যাবতীয় কার্যাদি পরিচালনা করাই হলো ইবাদত। তাই কোনো নিয়মতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতার সাথে তাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলা ইবাদত সম্বন্ধে অজ্ঞাতারই বহিঃপ্রকাশ। অতীব পরিতাপের সাথে বলতে হচ্ছে উলে¬খযোগ্য সংখ্যক মানুষ ইবাদতের এ মর্ম বুঝতে ভুল করেছে এবং এর সঠিক জ্ঞান থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছে। এসব লোককে তিনভাগে ভাগ করা যায়:

এক. এরা ইবাদতকে আংশিকভাবে বুঝেছে। তাদের মতে ইবাদত আল্লাহ প্রদত্ত কতিপয় অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এর বাইরে কোনো ইবাদত নেই। যেমন সালাত, সওম, হজ্ব, যাকাত ইত্যাদি। এ ছাড়া জীবন পরিচালনায় মানুষ স্বাধীন। সেখানে আল্লাহপ্রদত্ত কোনো নিয়ম-নীতি মানুষ মানতে বাধ্য নয়। এটি ইবাদত সম্বন্ধে অসম্পূর্ণ জ্ঞান। ভুল ধারণা। আল্লাহ তাআলা বলেন :

{أَفَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّونَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ}

‘ তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর কিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন’ (সূরা আল বাকারা: ৮৫)।

দুই.এরা ইবাদত আল্লাহ ছাড়া অন্যের নিমিত্তে সম্পাদন করে। গাইরুল্লাহর বিধানের আনুগত্য করে। গাইরুল্লাহর নামে যবেহ করে। গাইরুল্লাহর নামে শপথ করে, বিপদ ও রোগ মুক্তির জন্য গাইরুল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে ইত্যাদি। অথচ মহান আল্লাহ বলছেন :

{ أَمَّنْ يُجِيبُ الْمُضْطَرَّ إِذَا دَعَاهُ وَيَكْشِفُ السُّوءَ وَيَجْعَلُكُمْ خُلَفَاءَ الْأَرْضِ أَئِلَهٌ مَعَ اللَّهِ قَلِيلًا مَا تَذَكَّرُونَ }

‘ বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের আহ্বানে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন আর তোমাদেরকে যমিনের প্রতিনিধি বানান। আল্লাহর সাথে কি অন্য কোনো ইলাহ আছে? তোমরা কমই উপদেশ গ্রহণ করে থাক’ (সূরা আন নামল: ৬২)।

তিন.এদের অবস্থা হল, এরা ইবাদত আল্লাহর উদ্দেশ্যেই সম্পাদন করে। এদের ইখলাসে কোনো ত্র“টি নেই। কিন্তু ইবাদতটি সম্পাদন করে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত পদ্ধতি ভিন্ন অন্য পদ্ধতিতে। তাই এদের ইবাদতও প্রত্যাখ্যাত।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:

{مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ.}

‘যে ব্যক্তি আমাদের এই দীনে নতুন কিছু সংযোজন করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা হবে প্রত্যাখ্যাত’ (বুখারী ও মুসলিম)

সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত দীনের ওপর কিছু বাড়ালো, তাঁর দেয়া বিধানের সাথে নিজের পক্ষ থেকে কিছু সংযোজন করল, সে কি ইবাদত ও দাসত্বের পরিপূর্ণ হক আদায় করল? দাসত্বে কি নিজের পক্ষ থেকে সংযোজন-বিয়োজনের চিন্তা করা যায়? তাহলে তা কবুল হবার আশা করা যায় কিভাবে? এরা মূলতঃ আল্লাহর দাসত্ব ত্যাগ করেছে। আর গ্রহণ করেছে প্রবৃত্তি ও শয়তানের দাসত্ব। মহান আল্লাহ এ থেকে বান্দাদের সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে :

أَفَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَهَهُ هَوَاهُ وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ وَخَتَمَ عَلَى سَمْعِهِ وَقَلْبِهِ وَجَعَلَ عَلَى بَصَرِهِ غِشَاوَةً فَمَنْ يَهْدِيهِ مِنْ بَعْدِ اللَّهِ أَفَلَا تَذَكَّرُونَ

{‘ তবে তুমি কি তাকে লক্ষ্য করেছ, যে তার প্রবৃত্তিকে আপন ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? তার কাছে জ্ঞান আসার পর আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন এবং তিনি তার কান ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন। আর তার চোখের ওপর স্থাপন করেছেন আবরণ। অতএব আল্লাহর পর কে তাকে হিদায়েত করবে? তারপরও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না’? } (সূরা আল জাসিয়া: ২৩)।

প্রিয় বন্ধুগণ! বান্দা তার রবের ইবাদত করবে, তবে কত দিন? তার শেষ সীমানা কোথায়? এ প্রশ্নের জবাব মহান আল্লাহ নিজেই দিচ্ছেন, বলছেন :

{ وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ الْيَقِينُ }

‘আর ইয়াকীন তথা মৃত্যু আসা পর্যন্ত তুমি তোমার রবের ইবাদত কর’ (সূরা আল হিজর: ৯৯)।

اللَّهُمَّ صَل عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَبَارِكْ عَلى مُحَمَّدٍ وَعَلى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلى آلِ إِبْراهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ .

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে যথার্থরূপে ইবাদত আদায়ের তাওফীক দান করুন। ইবাদতরে সঠিক অর্থ ও তাৎপর্য বুঝার তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহ আপনি আমাদেরকে আপনার আবেদ হিসেবে কবুল করুন। জীবনের সকল ক্ষেত্রে আপনার ইবাদত ও দাসত্ব করার তাওফীক দিন। হে আল্লাহ ! আম্বিয়ায়ে কেরাম, সালিহীনগণ যেভাবে আপনাকে ইবাদত করেছেন আমাদেরকেও সেভাবে ইবাদত করার তাওফীক দিন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের ইবাদতের যাবতীয় ভুলত্র“টি ক্ষমা করে দিন। আপনি আমাদের সকল ইবাদত কবুল ও মঞ্জুর করুন। আমীন, ইয়া আরহামার রাহিমীন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.