পাঠ সংক্ষেপ

সালাত দ্বীনের স্তম্ভ ও কালেমার পর সবচেয়ে গুরুত্বপর্ণ রোকন। কিয়ামত দিবসে সর্বপ্রথম এ বিষয়টির হিসাব হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যুকালীন সময়ে নামাজের বিষয়ে উম্মতকে অসিয়ত করে গিয়েছেন। সাহাবাগণ নামাজের জামাআত থেকে যারা দূরে থাকত তাদেরকে মুনাফিক হিসাবে সাব্যস্ত করতেন, নামাজ গুরুত্বপর্ণ হওয়ার সবচেয়ে বড় দিক হলো এটি কোন মাধ্যম ছাড়াই সাত আসমানের উপর ফরজ করা হয়েছে। খুতবায় বিষয়টি বিস্তারিতভাবে দলিল-প্রমাণ সহ তুলে ধরা হয়েছে।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ جَعَلَ الصَّلَاةَ عِمَادَ الدِّيْنِ، وَجَعَلَهَا كِتَاباً مَوْقُوْتاً عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ فَقَالَ وَهُوَ أَصْدَقُ الْقَائِلِيْنَ :

{ حَافَظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُوْمُوْا لِلَّهِ قَانِتِيْنَ } (سورة البقرة : 238)

وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْدُ :

নামাজ পড়ো নামাজ ধরো মুমিন মুসলমান

খুশুখুজুর শিখা নিয়ে থাকো অনির্বাণ।

প্রিয় উপস্থিতি!

নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা দীন-ইসলাম দ্বারা এই উম্মতকে সম্মানিত করেছেন। তিনি এই দীনকে পূর্ণতা দিয়েছেন এবং মানুষের জন্য একমাত্র বিধানরূপে সাব্যস্ত করেছেন। যারা এই দীন মোতাবেক চলবে তাদেরকে তিনি এমন উত্তম বদলা ও মনোমুগ্ধকর বাসস্থান দান করবেন, যা প্রতিটি হৃদয় কামনা করে এবং যা দেখে প্রতিটি চক্ষু শীতল হবে।

এই দীন কতিপয় মজবুত ও শক্ত ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত, যার মধ্যে অন্যতম একটি হলো নামাজ। নামাজ ইসলামের খুঁটি এবং ঈমানের পর অতি গুরুত্বপূর্ণ রুকন। যারা সুন্দরভাবে নামাজ আদায় করবে আল্লাহ তাআলা তাদেরকে অসংখ্য পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন। হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এক নামাজের পর আরেক নামাজ, এ দুয়ের মধ্যখানে কোনো অনর্থক কাজকর্ম না হলে, তা ঊর্ধ্বজগতে লিখা হয় (আবু দাউদ, হাসান)।

অন্য এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, নামাজ সর্বোত্তম বিষয়। অতএব যে চায় সে যেন তা বাড়িয়ে নেয় (তাবারানী, হাসান)।

নামাজ কল্যাণের আধার। তাই যারা কল্যাণপ্রার্থী, যারা কল্যাণের পাল্লা ভারী করতে চায়, তাদের উচিত নামাজকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা। নামাজ আদায়কে জীবনের অন্যতম মিশন হিসেবে গ্রহন করা।

মুমিন কখনো নামাজে অবহেলা করতে পারে না। ইরশাদ হয়েছে:

{حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَى وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِين }

‘তোমরা সমস্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হও, বিশেষ করে মধ্যবর্তী নামাজের প্রতি’ (সূরা বাকারা : ২৩৮)।

আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমার কাছে সবচে’ প্রিয় জিনিস হলো, নারী ও সুগন্ধি। আর আমার চোখের শীতলতা নামাজের মধ্যে নিহিত’ (বুখারী)।

সুপ্রিয় মুসল্লিয়ান! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমনিভাবে নামাজকে চক্ষু শীতলকারী বস্তুরূপে গ্রহণ করেছেন তেমনি আপনারাও নামাজকে চক্ষু শীতলকারী বস্তুরূপে গ্রহণ করুন।

বস্তুত নামাজে রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি ও হৃদয়ের স্থিরতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা বিলাল রাযি. কে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে বিলাল! তুমি আমাদেরকে নামাজের মাধ্যমে আরাম দাও’ (তাবারানী: আল মু‘জামুল কাবীর, সহীহ)।

নামাজ প্রথম ইবাদত যা বান্দার প্রতি আল্লাহ তাআলা ফরয করেছেন এবং নামাজের ব্যাপারেই কিয়ামতের ময়দানে সর্বপ্রথম হিসাব নেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইন্তেকালের সময় উম্মতকে যে সর্বশেষ অসিয়ত করে গেছেন, তা হল নামাজ। মানুষের ইবাদত বন্দেগীর তালিকা থেকে সর্বশেষে বিলুপ্ত হবে নামাজ। আর নামাজ বিলুপ্ত হলে দীনচর্চার আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।

নামাজ মানুষকে অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে দূরে রাখে। নামাজ সমাজকে সকল প্রকার অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বাঁচায় । ইরশাদ হয়েছে:

{ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ }

‘নিশ্চয় নামাজ যাবতীয় অন্যায় ও অশ্লীল-অপকর্ম থেকে বিরত রাখে’ (সূরা আনকাবুত: ৪৫)।

নামাজ এমন একটি ইবাদত যা সপ্তাকাশের উপরে জিবরীল (আ)-এর মাধ্যম ছাড়াই সরাসরি ফরয হয়েছে। নামাজ আল্লাহ ও বান্দার মাঝে এক সেতুবন্ধন।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! মুসল্লীদের মধ্যে এমন অনেককে দেখা যায়, যারা নামাজের সময় কাকের মতো ঠোকর মারে। অতি দ্রুত নামাজ শেষ করে বের হয়ে যায়। নামাজে তারা ধীরস্থিরতা অবলম্বন করে না। বস্তুত তারা নামাজের মধ্যে কোনোরূপ স্বাদ ও তৃপ্তি অনুভব করতে ব্যর্থ হয়। নামাজে তারা আল্লাহ তা*আলাকে খুব কমই স্মরণ করে।

নামাজের মধ্যে বারবার এদিক-সেদিক তাকানো, শরীর চুলকানো, নামাজ অবস্থায় স্বীয় মাল বিনষ্ট হয়ে যাওয়ার চিন্তা করা ইত্যাদি নামাজের পরিপন্থি বিষয়। হাদীসে এসেছে:

(أَنَّ رَجُلًا دَخَلَ الْمَسْجِدَ، وَرَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ جَالِسٌ فِي نَاحِيَةِ الْمَسْجِدِ فَصَلَّى، ثُمَّ جَاءَ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ، فَقَالَ لَهُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَعَلَيْكَ السَّلَامُ، ارْجِعْ فَصَلِّ فَإِنَّكَ لَمْ تُصَلِّ، فَرَجَعَ فَصَلَّى، ثُمَّ جَاءَ فَسَلَّمَ، فَقَالَ: وَعَلَيْكَ السَّلَامُ، فَارْجِعْ فَصَلِّ، فَإِنَّكَ لَمْ تُصَلِّ "، فَقَالَ فِي الثَّانِيَةِ أَوْ فِي الَّتِي بَعْدَهَا: عَلِّمْنِي يَا رَسُولَ اللَّهِ، فَقَالَ: إِذَا قُمْتَ إِلَى الصَّلَاةِ فَأَسْبِغِ الْوُضُوءَ، ثُمَّ اسْتَقْبِلِ الْقِبْلَةَ فَكَبِّرْ، ثُمَّ اقْرَأْ بِمَا تَيَسَّرَ مَعَكَ مِنَ الْقُرْآنِ، ثُمَّ ارْكَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ رَاكِعًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَسْتَوِيَ قَائِمًا، ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ جَالِسًا، ثُمَّ اسْجُدْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ سَاجِدًا، ثُمَّ ارْفَعْ حَتَّى تَطْمَئِنَّ جَالِسًا، ثُمَّ افْعَلْ ذَلِكَ فِي صَلَاتِكَ كُلِّهَا)

‘এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মসজিদের এক প্রান্তে বসা ছিলেন। লোকটি নামাজ পড়ে এসে ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম করল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘ওয়া আলাইকাস সালাম, তুমি ফিরে যাও, নামাজ পড়। কারণ তুমি নামাজ পড়নি’। সে ফিরে গেল, নামাজ পড়ল তারপর এসে সালাম করল। তিনি বললনে, ‘ওয়া আলাইকাস সালাম, তুমি ফিরে যাও, নামাজ পড়। তুমিতো নামাজ পড়নি। দ্বিতীয়বার অথবা তার পরের বার লোকটি বলল, ‘আমাকে শিখিয়ে দিন, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললনে, ‘যখন তুমি নামাজে দাঁড়াতে মনস্থ করবে, ভালভাবে অজু করবে। তারপর কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে তাকবীর বলবে। তারপর তোমার সাধ্যমত কুরআন পড়বে। তারপর রুকুতে যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে রুকু করবে। তারপর রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াবে। তারপর সিজদায় যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে সিজদা করবে। এরপর মাথা উঠিয়ে ধীরস্থিরভাবে বসবে। অতঃপর আবার সিজদায় যাবে এবং ধীরস্থিরভাবে সিজদা করবে। এরপর সিজদা থেকে উঠে সোজা হয়ে বসবে। অতঃপর পুরা নামাজেই তুমি এরূপ করবে’ (বুখারী)।

মুহতারাম উপস্থিতি! নামাজকে অর্থবহ করে তোলার জন্য, নামাজকে সজীব ও প্রাণবন্ত করে তোলার জন্য, নামাজে হৃদয়ের উপস্থিতি সুনিশ্চিত করার জন্য, নামাজে যা পড়া হয় অথবা করা হয় তার অর্থ ও তাৎপর্য হৃদয়ে হাজির করা জরুরি। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি যখন নামাজ পড়ার সময় তাকবীর বলে এবং দু’হাত উত্তোলন করে তখন এর দ্বারা সে আল্লাহ তাআলাকে তাযীম তথা সম্মান প্রদর্শন করে। সে যখন বাম হাতের উপর ডান হাত রাখে, তখন সে আল্লাহর সামনে নিজের দীনতা ও হীনতা প্রদর্শন করে। যখন সে রুকু করে তখন সে আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ করে। যখন সিজদা করে তখন সে মহান আল্লাহর সামনে পূর্ণমাত্রায় বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে। যখন সে বলে

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ

তখন আল্লাহ তাআলা আরশে আযীমের উপর থেকে বলতে থাকেনÑ আমার বান্দা আমার প্রশংসা করেছে। যখন সে বলে

الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার গুণ বর্ণনা করেছে। যখন সে বলে

مَالِكِ يَوْمِ الدِّيْنِ

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, আমার বান্দা আমার মহিমা বর্ণনা করেছে। যখন সে বলে

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِيْنُ

তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এটা আমার ও আমার বান্দার মধ্যে বিভক্ত। আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা সে পাবে। আর যখন

إِهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيْمَ

থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠ করে তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, এটা শুধু আমার বান্দার জন্য। আর আমার বান্দা যা চেয়েছে তা সে পাবে। আপনি যখন

سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيْمْ، سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى

বলেন, যদিও আপনি খুব ক্ষীণ আওয়াজে বলেন তথাপি আল্লাহ তাআলা তা শুনতে পান। কেননা আল্লাহ তাআলা বান্দার প্রকাশ্য-গোপনীয় সব কথা শোনেন এবং সব কাজই দেখেন তা যত ক্ষদ্র কাজই হোক না কেন। এমনিভাবে আপনি যত ছোট বিষয় নিয়েই চিন্তা-ফিকির করেন না কেন, আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে অবহিত। আপনি যখন নামাজের মধ্যে সিজদার স্থানে দৃষ্টিপাত করেন তখন আল্লাহ তাআলা আপনাকে দেখেন। আপনি তাশাহহুদ পড়ার সময় যখন আঙ্গুল নেড়ে ইশারা করেন, তখন আল্লাহ আল্লাহ তাআলা আপনার ইশারাও দেখতে পান। কেননা তিনি তার বান্দাকে স্বীয় ইলম ও কুদরত দ্বারা চতুর্দিক থেকে বেষ্টন করে আছেন।

অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করার পাশাপাশি নামাজসহ আমাদের যাবতীয় ইবাদত-বন্দেগী যাতে বিশুদ্ধভাবে, সুন্দরভাবে আদায় করা সম্ভব হয় সে জন্য আমাদেরকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। এ ব্যাপারে হাদীসে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। সাহাবী মুআয রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

( اللَّهُمَّ أَعِنِّيْ عَلَى ذِكْرِكَ وَشُكْرِكَ وَحَسُنِ عِبَادَتِكَ )

‘হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আপনার যিকর, আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সুন্দরভাবে আপনার ইবাদত করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করুন’ (আহমদ, আবু দাউদ)।

নামাজে ধীরস্থিরতা, খুশু ও বিনয় নম্রতা অবলম্বন করার গুরুত্ব এখান থেকেও বুঝা যায় যে, মুমিনদের মধ্যে যারা খুশুর সাথে নামাজ আদায় করেন তাদের সফলকাম হওয়ার ব্যাপারে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা সাক্ষী দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

{ قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ . الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ لِلزَّكَاةِ فَاعِلُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ . إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ . فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْعَادُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ لِأَمَانَاتِهِمْ وَعَهْدِهِمْ رَاعُونَ . وَالَّذِينَ هُمْ عَلَى صَلَوَاتِهِمْ يُحَافِظُونَ . }

‘মুমিনগণ অবশ্যই সফলকাম হয়েছে। যারা নিজেদের নামাজে বিনয়-নম্র। যারা অনর্থক কথা-বার্তায় নির্লিপ্ত। যারা যাকাত প্রদানে সক্রিয় এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ছাড়া এতে তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা হবে সীমালংঘনকারী। আর যারা আমানাত ও অঙ্গীকার রা করে। যারা তাদের নামাজসমূহে যতœবান থাকে। তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে তাঁরা ফিরদাওসের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে’ (সূরা মুমিনূন : ১-১১)।

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن ِالْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر ِالحْكِيْمِ, أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو َالْغَفُور ُالرَّحِيْمْ

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ جَعَلَ الصَّلَاةَ عَلَى الْمُؤْمِنِيْنَ كِتَاباً مَّوْقُوْتاً، وَوَعَدَ مَنْ حَافَظَ عَلَيْهَا بِجَزِيْلِ الثَّوَابِ، وَتَوَعَّدَ مِنْ تهَاوَنَ بِهَا بَأَلِيمِ الْعِقَابِ. وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَاشَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ جُعِلَتْ قُرَّةُ عَيْنِهِ فِي الصَّلَاةِ، أَمَّا بَعْدُ:

প্রিয় মুসল্লী ভাইয়েরা! বর্তমান সমাজে নামাজের প্রতি অবহেলা তীব্র আকার ধারণ করেছে। অথচ নামাজ মুসলমানের পরিচয়, ঈমান ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য নির্ধারক একটি ইবাদত। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ ঈমান ও কুফরের মধ্যে তফাৎ হল নামাজ না পড়া’ (মুসলিম)

বুরাইদা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘আমাদের ও তোমাদের মাধ্যে যে অঙ্গীকার, তা হলো নামাজ। অতএব যে ব্যক্তি নামাজ পরিত্যাগ করল, সে কুফরী করল’ (আহমদ, আবু দাঊদ, নাসাঈ, তিরমিযি)।

ছাওবান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘ঈমান ও কুফরীর মধ্যে পার্থক্য হল নামাজ। যে ব্যক্তি নামাজ ছেড়ে দিল সে শিরক করল’ (তাবারানী, সহীহ)।

আবদুল্লাহ ইবন শাকীক আল উকাইলি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবীগণ নামাজ পরিত্যাগ করা ছাড়া অন্য কোনো আমল পরিত্যাগ করাকে কুফরী বলে মনে করতেন না (তিরমিযী আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন)।

মুহতারাম মুসল্লিয়ান! ফরয নামাজ পুরুষের জন্য জামাতের সাথে আদায় করা অত্যাবশ্যক। শরঈ ওযর ছাড়া একাকী নামাজ পড়লে শুধু যে ছাওয়াব কম হয় তাই নয়, বরং নামাজই কবুল হয় না বলে হাদীসে সতর্কবাণী এসেছে।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, যে ব্যক্তি আযান শোনার পর কোনোরূপ ওযর ছাড়াই জামাতে শরীক হয় না, (বরং আপন স্থানে নামাজ পড়ে নেয়) তার নামাজ কবুল হয় না (ইবনে মাজাহ, হাকিম)।

আবুদ-দারদা রাযি. বলেন, আমি রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘যে গ্রামে বা মাঠে কমপে তিনজন লোক থাকে অথচ তারা সেখানে জামাতে নামাজ পড়ে না, শয়তান তাদের উপর সওয়ার হয়। অতএব জামাতকে আঁকড়ে ধরো। কেননা দলত্যাগকারী বকরীকেই বাঘে খেয়ে ফেলে (আহমদ, নাসায়ী, আবু দাউদ)।

আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেন, ‘আমার মনে চায়, আমার কিছু যুবককে এক বোঝা লাকড়ি সংগ্রহ করতে আদেশ দিই, তারপর আমি ঐসব লোকের নিকট যাই যারা বিনা ওযরে ঘরেই নামাজ আদায় করে। এবং গিয়ে তাদের বাড়ীঘর আগুনে পুড়িয়ে দেই’।

এই হাদীস বর্ণনাকারী ইয়াযীদকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এ সতর্কবাণী কি শুধু জুমআর নামাজের জন্য, নাকি সব নামাজের জন্য? উত্তরে তিনি বলেন, আবু হুরাইরা রাযি. উল্লেখ করেননি যে, এটা শুধু জুমআর নামাজের জন্য নাকি সব নামাজের জন্য। যদি আমি তার কাছ থেকে এ হাদীস না শুনে থাকি তাহলে আমার কর্ণদ্বয় বধির হয়ে যাক (মুসলিম, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী)

ইবনে মাসউদ রাযি. বলেন, ‘তোমরা যদি অমুক ব্যক্তির ন্যায় ঘরেই নামাজ পড়তে আরম্ভ কর তবে তোমরা নবীজির সুন্নত তরককারী বলে গণ্য হবে। আর যদি তোমরা নবীজির সুন্নত ছেড়ে দাও তবে তোমরা নিশ্চিত গোমরাহ হয়ে যাবে (মুসলিম)।

প্রিয় মুসলিম ভাইয়েরা! নামাজ আল্লাহ তাআলার প থেকে ফরয করে দেয়া একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। তাই নিজেরা নামাজ পড়ার সাথে সাথে পরিবারের সকল সদস্যকে নামাজ পড়ার তাগিদ দিতে হবে। নিজদেরকে জাহান্নামের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচানোর সাথে সাথে পরিবারের সকল সদস্যকে দোযখ থেকে বাঁচানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ইরশাদ হয়েছে:

{ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا }

‘হে মুমিনগন! তোমরা নিজ এবং তোমাদের পরিবারের লোকদেরকে আগুন থেকে বাঁচাও’ (সূরা আত-তাহরীম: ৬১)।

অন্য আয়াতে তিনি বলেন:

{وَأْمُرْ أَهْلَكَ بِالصَّلَاةِ وَاصْطَبِرْ عَلَيْهَا }

‘তুমি তোমার পরিবারের লোকদেরকে নামাজের আদেশ দাও এবং তুমি নিজেও এতে অবিচল থাক’ (সূরা তাহা:১৩২)।

আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাযি. থেকে বর্ণিত রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বৎসরে উপনীত হলে তোমরা তাদেরকে নামাজের আদেশ করো। তাদের বয়স দশ বৎসরে উপনীত হওয়ার পরও তারা নামাজ না পড়লে তাদেরকে প্রহার করো (আহমদ, আবু দাউদ)।

প্রিয় মুসল্লিয়ান! আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে তাঁর নবীর উপর দরূদ পাঠ করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:

{ إِنَّ ٱللَّهَ وَمَلَـٰئِكَـتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى ٱلنَّبِىّ يٰأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءامَنُواْ صَلُّواْ عَلَيْهِ وَسَلِّمُواْ تَسْلِيماً }

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং ফিরিশতাগণ নবীর জন্য দু‘আ করেন। হে ঈমানদারগণ! তোমরাও তার প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করো’ (সূরা আল আহযাব: ৫৬)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পড়বে আল্লাহ তাআলা তার উপর দশটি রহমত নাযিল করবেন (মুসলিম)।

হে করুণার আধার! আপনি আমাদের আপন আপন দেশে নিরাপত্তা দিন। ইসলাম, মুসলমান ও দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে এমন নেতৃত্ব আমাদেরকে দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সঠিক পথ প্রদর্শন করো। যারা এ পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা ও অশান্তি সৃষ্টি করে তাদের থেকে আমাদেরকে দূরে রাখুন। হে করুণাময় আল্লাহ! আমরা আপনার কাছে চাই যে আপনি আমাদের সমাজ থেকে সুদ, ঘুষ, ব্যাভিচার এবং এগুলোর যাবতীয় আসবাব-উপকরণ উঠিয়ে নিন। আপনি আমাদেরকে, আমাদের দেশকে এবং গোটা মুসলিম বিশ্বকে হিফাযত করুন ভুমিকম্প ও প্রকাশ্য-গোপনীয় যাবতীয় ফিতনা থেকে। হে দয়াময় প্রভু! আমরা সবাই আপনার কাছে সঠিক পথ প্রার্থনা করি। অতএব হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নারী-পুরুষ, ছোট-বড়, আলেম-উলামা এবং প্রশাসনিক দায়িত্বে নিয়োজিত সকলকে সঠিক পথে পরিচালিত করো।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : ( إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ والْمُنْكرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.