পাঠ সংক্ষেপ

আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছ থেকে যে দীনদারী চান তাহলো, মানুষ দিনে রাতে, সকালে সন্ধ্যায় এক কথায় ২৪টি ঘণ্টাই সে আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাকে স্মরণ করবে। যেখানে, যেভাবেই থাকুক না কেন এক মুহূর্তের জন্যও সে তাকে ভুলে যাবে না। তাকে বিস্মৃত হবে না। মোটকথা তার জীবনের প্রতিটি কাজ পরিচালিত হবে আল্লাহর মর্জি মুতাবিক এবং তার দেওয়া বিধি-বিধানের সীমানায় আবদ্ধ থেকে। এতে তার জীবন সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে এবং রা পাবে সে যাবতীয় বিপদাপদ থেকে।

যিকরুল্লাহ বা আল্লাহ তাআলার স্মরণ

(প্রথম খুতবা)

الْحَمْدُ لِلَّهِ حَمْدَ الشَّاكِرِيْنَ، وَالصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى خَيْرِ الذَّاكِرِيْنَ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ ، أَمَّا بَعْدُ :

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আমি আমার নিজকে এবং আপনাদের সবাইকে তাকওয়া তথা আল্লাহ-ভীতি অর্জনের ব্যাপারে অসিয়ত করছি। অতএব আপনারা প্রকাশ্যে এবং গোপনে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করুন, তাঁর ইবাদত করুন, তাঁর তরে সিজদায় লুটিয়ে পড়ুন এবং সকল প্রকার ভালো কাজে নিমগ্ন থাকুন। এতে আপনারা উভয় জাহানে সফল হবেন। কৃতকার্য হবেন। কামিয়াবী আপনাদের পদচুম্বন করবে।

সুপ্রিয় শ্রোতামণ্ডলী! নিশ্চয় মানুষের অন্তরসমূহ অন্যসব প্রাণীর অন্তরসমূহের মতোই। জীবন রা ও প্রাণশক্তি বৃদ্ধির জন্য মানুষের যেমনি বিভিন্ন উপাদান-উপকরণের প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন অন্যান্য প্রাণীদেরও।

এ ব্যাপারে সকল বুদ্ধিমান লোকেরা একমত যে, লোহায় যেমন মরিচা ধরে তেমনি অন্তরেও মরিচা ধরে। গাছপালা ও ফসলাদি যেমন তৃষিত হয় তেমনি অন্তরও তৃষিত হয়। পশুর স্তন যেমন দুধশূন্য হয়ে শুকিয়ে যায় তেমনি অন্তরও শুকিয়ে যায়। তাই স্বচ্ছকরণ ও সিঞ্চিতকরণ দুটোই অন্তরের জন্য অতীব প্রয়োজন। কেননা এগুলো অন্তরকে মরিচামুক্ত করে ও তার পিপাসা নিবারণ করে।

প্রতিটি মানুষ তার জীবদ্দশায় শত্র“বেষ্টিত। চতুর্দিক থেকে তাকে ঘিরে রেখেছে অসংখ্য দুশমন। এসব দুশনের মধ্য থেকে একটি বড় দুশমন হলো নফসে আম্মারা। তা মানুষকে ধ্বংসের ঘাটিতে নিয়ে যায়। অনুরূপভাবে কুপ্রবৃত্তি ও শয়তান হলো মানুষের আরো দু’টি শত্রু। কেননা এরাও মানব জীবনকে ধ্বংস ও বরবাদ করে দেয়।

সুতরাং এসব শত্রুরর হাত থেকে নিষ্কৃতি লাভের জন্য মানুষের প্রয়োজন এমন কিছু হাতিয়ারের, যা তাকে নিরাপত্তা দিবে, তার ভয় দূর করবে এবং তার অন্তরকে প্রশান্ত রাখবে।

মানুষের এসব শত্রুকে পরাভূতকরণ এবং মানবাত্মার যাবতীয় রোগ নিরাময়ের সবচে’ বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে যে জিনিস তাহলো আল্লাহর যিকর। যিকর মানুষের অন্তরকে স্বচ্ছ ও আলোকিত করে। রুগ্ন ও অসুস্থ অন্তরকে সুস্থ করে তুলে।

আল্লামা ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন । আমি ইবনে তাইমিয়া রহ.কে বলতে শুনেছি ‘মাছের জন্য যেমন পানির প্রয়োজন তেমনি অন্তরের জন্য যিকরের প্রয়োজন। অর্থাৎ মাছ যেমন পানি ছাড়া বাঁচতে পারে না তেমনি অন্তরও যিকর ছাড়া জীবিত থাকে না’।

হে আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ তাআলা ও বান্দার মাঝে যে সম্পর্ক তা শুধু ভোর বেলার দুআর সাথে সীমাবদ্ধ নয়। সীমাবদ্ধ নয় বিকেল বেলার দুআর সাথেও। আমাদের অনেকের বেলায় দেখা যায়, আমরা গোটা দিবসের মধ্যে একটু আধটু সময় আল্লাহকে স্মরণ করি, মশগুল হই তার যিকরে। এরপর আর কোনো খবর থাকে না। সারাদিন কেটে যায় গাফেল অবস্থায়। একটি বারের জন্যও স্মরণ করা হয় না পরমপ্রিয় মাওলা আল্লাহ তাআলাকে। কোনো বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা না করে যেভাবে মনে চায় সেভাবেই করতে থাকি দুনিয়ার কাজ। মনে রাখবেন, এ হলো ধোঁকা ও প্রতারণামূলক দীনদারী। এরূপ দীনদারী আল্লাহর কাম্য নয়।

আল্লাহ তাআলা মানুষের কাছ থেকে যে দীনদারী চান তাহলো, মানুষ দিনে রাতে, সকালে সন্ধ্যায় এক কথায় ২৪টি ঘণ্টাই সে আল্লাহ তাআলার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে, তাকে স্মরণ করবে। যেখানে, যেভাবেই থাকুক না কেন এক মুহূর্তের জন্যও সে তাকে ভুলে যাবে না। তাকে বিস্মৃত হবে না। মোটকথা তার জীবনের প্রতিটি কাজ পরিচালিত হবে আল্লাহর মর্জি মুতাবিক এবং তার দেওয়া বিধি-বিধানের সীমানায় আবদ্ধ থেকে। এতে তার জীবন সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠবে এবং রা পাবে সে যাবতীয় বিপদাপদ থেকে।

প্রতিটি মুসলমানকে ইসলাম এ বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করে যে, সে যেন তার প্রতিপালকের সাথে গভীর সম্পর্ক বজায় রাখে। যদ্বারা তার অন্তর পরিশুদ্ধ হয়, হৃদয় পবিত্র হয় এবং সে তার প্রতিপালকের কাছেই সাহায্য ও মদদ কামনা করে। অন্যের কাছে নয়।

এ জন্যই পবিত্র কুরআন ও হাদীসে আল্লাহ তাআলার সাথে গভীর সম্পর্ক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সর্বদা অধিক পরিমাণে যিকর করার কথা খুব গুরুত্বের সাথে বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

{ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا ، وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا }

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো এবং সকাল ও সন্ধ্যায় তার পবিত্রতা বর্ণনা করো’ (সূরা আল আহযাব: ৪১-৪২)।

মুমিনদের বিভিন্ন গুণাবলীর মধ্যে এটাও একটি যে তারা বেশি বেশি আল্লাহর তাআলার যিকর করে। ইরশাদ হয়েছে :

{ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُمْ مَغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا }

‘আল্লাহকে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও নারী, তাদের জন্য আল্লাহ মাগফিরাত ও মহান প্রতিদান প্রস্তুত রেখেছেন’ (সূরা আল আহযাব: ৩৫)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :

{ وَاذْكُرُوا اللَّهَ كَثِيرًا لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ }

‘আর তোমরা আল্লাহ তাআলাকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করো। যাতে তোমরা সফল হতে পারো’ (সূরা আল জুমআ: ১০)।

আরো ইরশাদ হয়েছে :

{ فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ }

‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো। আমি তোমাদেরকে স্মরণ করব’ (সূরা আল বাকারা: ১৫২)।

অন্য এক আয়াতে এসেছে :

{ وَلَذِكْرُ اللَّهِ أَكْبَرُ }

‘আল্লাহর স্মরণই সবচেয়ে বড় (সূরা আল আনকাবুত: ৪৫)।

সহীহ বুখারীর হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

( كَلِمَتَانِ حَبِيْبَتَانِ إِلَى الرَّحْمَنِ خَفِيفَتَانِ عَلَى اللِّسَانِ ، ثَقِيْلَتَانِ فِي الْمِيْزَانِ : سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ ، سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيْم )

‘দুটি কালেমা এমন আছে যা আল্লাহ তাআলার কাছে খুব প্রিয়, পড়তেও খুব সহজ এবং মীযানের পাল্লায় খুব ভারী। কালেমা দু’টি হলো, সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি সুবহানাল্লাহিল আযীম’ (বুখারী)।

একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদেরকে বললেন :

( أَلا أُنَبِّئُكُمْ بِخَيْرِ أَعْمَالِكُمْ وَأَرْفَعِهَا فِي دَرَجَاتِكُمْ، وَخَيْرٍ لَكُمْ مِنْ إِعْطَاءِ الذَّهَبِ وَالْفِضَّةِ، وَخَيْرٍ لَكُمْ مِنْ أَنْ تَلْقَوْا عَدُوَّكُمْ، فَيَضْرِبُوا أَعْنَاقَكُمْ، وَتَضْرِبُوا أَعْنَاقَهُمْ؟ قَالُوا: وَمَا ذَاكَ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ: ذِكْرُ اللَّهِ )

‘আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি আমলের কথা বলব না যা যাবতীয় আমল হতে উত্তম, তোমাদেরকে সর্বাধিক মর্যাদা দানকারী, আর আল্লাহর রাস্তায় স্বর্ণ ও রৌপ্য খরচ করার চেয়েও অনেক উত্তম, আর এর থেকেও উত্তম যে তোমরা তোমাদের শত্র“র মুখোমুখী হবে, অতঃপর তারা তোমাদের ঘারে আঘাত করবে এবং তোমরাও তাদের ঘারে আঘাত করবে। সাহাবায়ে কিরাম বললেন, সেটা কী, ইয়া রাসূলাল্লাহ? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেলন, ‘তা হলো আল্লাহর যিকর (তাবারানী: আদদুয়া, সহীহ)।

অন্য এক হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

( مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ غُرِسَتْ لَهُ نَخْلَةٌ فِيْ الْجَنَّةِ)

‘যে ব্যক্তি সুবহানাল্লাহি ওয়াবি হামদিহী পাঠ করবে তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুরবৃ রোপন করা হবে’ (তিরমিযী, হাসান)।

আল্লাহর বান্দাগণ! আল্লাহ তাআলার যিকর এমনই এক আমল যার উসীলায় তিনি বিপদাপদ, বালা-মুসীবত ও জীবনের নানাবিধ সংকট দূর করেন। শুধু তাই নয়, আল্লাহ তাআলা যিকরকারীদের জিহ্বাকে ঐরকম সুসজ্জিত ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করেন যেমন তিনি আলো দ্বারা দর্শকের দৃষ্টিকে আলোকময় করেন।

গাফেল অন্তঃকরণ হলো অন্ধ চোখ, বধির কান এবং অকেজো হাতের ন্যায়।

হাসান বসরী রহ. বলেন, তোমরা তিন জিনিসের মধ্যে স্বাদ তালাশ করো। নামাজে, যিকরে এবং কুরআন তিলাওয়াতে। যদি তোমরা এসবের মধ্যে স্বাদ পাও তবে তো ভালো। অন্যথায় ঝুঝবে যে, আল্লাহ তাআলা ও তোমাদের মধ্যে সম্পর্কের দরজা বন্ধ আছে।

আদম সন্তান যখন অচেতন হয় কিংবা আল্লাহর কথা বেমালুম ভুলে যায়, তখনই সে ছোট-বড় বিভিন্ন পাপে লিপ্ত হয়। কেননা আল্লাহর স্মরণ মানুষকে এমনই এক পূর্ণ জীবনীশক্তি দান করে যার বর্তমানে সে নিজকে জাহান্নামের অতল গহ্বরে ঠেলে দিতে কিংবা মহান আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে ফেলতে পারে না।

পান্তরে যে ব্যক্তি যিকর করে না কিংবা তার কথা ভুলে যায় সে মৃত সমতুল্য। শয়তান তাকে যে কোনো অপকর্মে লিপ্ত করাতে বিন্দুমাত্র পিছপা হয় না।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

{ وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ }

‘আর যে পরম করুণাময়ের যিকর থেকে বিমুখ থাকে আমি তার জন্য এক শয়তানকে নিয়োজিত করি। ফলে সে হয়ে যায় তার সঙ্গী’ (সূরা যুখরুফ: ৩৬)।

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা বলেন :

{ وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنْكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى }

‘আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে, তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে ওঠাব অন্ধ অবস্থায়’ (সূরা ত্বাহা: ১২৪)।

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন :

{ أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللَّهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلَا يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ}

‘যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি? আর তারা যেন তাদের মত না হয়, যাদেরকে ইতঃপূর্বে কিতাব দেয়া হয়েছিল, তারপর তাদের উপর দিয়ে দীর্ঘকাল অতিক্রান্ত হল, অতঃপর তাদের অন্তরসমূহ কঠিন হয়ে গেল। আর তাদের অধিকাংশই ফাসিক (সূরা হাদীদ: ১৬)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :

{ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ }

‘হে ঈমানদারগণ! ধন সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি যেন তোমাদেরকে যিকর থেকে গাফেল না রাখে, যারা এরূপ করবে তারা নিশ্চয়ই তিগ্রস্ত হবে’ (সূরা মুনাফিকুন : ৯)।

ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

( الشَّيْطَانُ جَاثِمٌ عَلَى قَلْبِ ابْنِ آدَمَ ، فَإِذَا سَهَا وَغَفَلَ وَسْوَسَ ، فَإِذَا ذَكَرَ اللهَ خَنَسَ )

‘শয়তান বনী আদমের অন্তরে জেঁকে বসে থাকে। অতঃপর সে যখন যিকর করে তখন সে পালিয়ে যায়। পান্তরে সে যখন গাফেল ও যিকরবিহীন অবস্থায় থাকে তখন সে তার অন্তরে বিভিন্ন রকমের ওয়াসওয়াসা দিতে থাকে (অর্থাৎ ধোঁকা ও নানাবিধ অশ্লীল চিন্তা ভাবনার উদ্রেক করে) [ তাযকিরাতুল হুফ্ফায, মাউকুফ]।

হে মুসলমানগণ! যতণ আপনাদের সাথে আল্লাহর যিকর থাকবে ততণ আপনাদের কোনো ভয় নেই। নেই কোনো চিন্তা ও দুর্ভাবনা। কেননা যিকরের কারণে আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে সকল প্রকার চিন্তা ও বিপদাপদ থেকে হিফাযত করবেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন :

{ الَّذِينَ آمَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ }

‘যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকর দ্বারা শান্তি লাভ করে জেনে রেখো, আল্লাহর যিকর দ্বারাই অন্তরসমূহ শান্তি পায়’ (সূরা রা’দ: ২৮)।

বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসীতে আছে- আল্লাহ তাআলা বলেন :

( أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِيْ، وَأَنَا مَعَهُ إِذَا ذَكَرَنِيْ، فَإِنْ ذَكَرَنِيْ فِيْ نَفْسِهِ ذَكَرْتُهُ فِيْ نَفْسِيْ، وَإِنْ ذَكَرَنِيْ فِيْ مَلَأٍ ذَكَرْتُهُ فِيْ مَلَأٍ خَيْرٍ مِنْهُمْ )

‘আমি বান্দার সাথে তার ধারণা অনুযায়ী ব্যবহার করে থাকি। যখন বান্দা আমাকে স্মরণ করে তখন আমি তার সাথে থাকি। যখন সে আমাকে মনে মনে স্মরণ করে তখন আমিও তাকে মনে মনে স্মরণ করি। আর যখন সে আমাকে কোনো মজলিসের মধ্যে স্মরণ করে আমি তাকে তার মজলিসের চেয়ে উত্তম মজলিস অর্থাৎ ফেরেশতাদের মজলিসে স্মরণ করি’ (বুখারী ও মুসলিম)।

আটা পিষা ও ঘরের অন্যান্য কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য একদা আলী ও ফাতেমা রাযি. নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে একজন খাদেম প্রার্থনা করলেন। তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি জিনিসের কথা বলব না যা খাদেমের চেয়েও তোমাদের বেশি উপকারে আসবে? যখন তোমরা বিছানায় যাবে তখন ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ এবং ৩৪বার আল্লাহু আকবার পাঠ করবে। এ হলো মৌখিক হিসেবে ১০০ বার কিন্তু মীযানের পাল্লায় ১০০০ বার পাঠ করার ছাওয়াব ওজন করা হবে।

আলী রাযি. বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মুখ থেকে একথা শুনার পর আমি কোনোদিন এ আমলটি পরিত্যাগ করিনি। এ সময় এক ব্যক্তি বলে উঠল, আপনি কি তা সিফফীন যুদ্ধের ভয়াবহ রাতেও পরিত্যাগ করেননি? জবাবে আলী রাযি. বললেন না, সে রাতেও আমি এ আমল পরিত্যাগ করিনি (আহমদ)।

আবু মূসা রাযি. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকর করে আর যে ব্যক্তি আল্লাহর যিকর করে না, তাদের দৃষ্টান্ত জীবিত ও মৃতের সমতুল্য (বুখারী, মুসলিম)।

জীবন সবার কাছে প্রিয় আর মৃত্যুকে সবাই ভয় করে। বর্ণিত হাদীস দ্বারা বুঝা যায়, যারা যিকর করে না, তারা জীবিত থাকা সত্ত্বেও মৃতের ন্যায়।

মুআয ইবনে জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, মানুষকে কবরের আজাব থেকে নাজাত দানকারী আল্লাহর যিকর থেকে বড় আর কোনো ইবাদত নেই (আহমদ)।

মুহতারাম হাযেরীন! উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, যিকর হলো এমন একটি আমল, যদ্বারা অন্তরে শান্তি আসে, শয়তান পাপকর্ম করানোর সুযোগ পায় না। আল্লাহর প থেকে বান্দার যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ হয়ে যায়। তাছাড়া আরো হাজারো ফায়দা তো আছেই। তাই আসুন, আমরা হৃদয় জাগ্রত রেখে জিহ্বা দিয়ে যিকর করি। সবসময় যিকর চালু রাখি। শুধু মনে মনে যিকর নয়, বরং প্রতিদিন নিয়মিত কিছু সময় হলেও আমরা মৌখিক যিকর করি এবং ২৪ ঘণ্টা প্রতিটি কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ، أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ

যিকরুল্লাহ বা আল্লাহ তাআলার স্মরণ

(দ্বিতীয় খুতবা)

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ أَمَرَنَا بِذِكْرِهِ وَوَعَدَ الذَّاكِرِيْنَ اللهَ كَثِيْراً وَالذَّاكِرَاتِ مَغْفِرَةً وَأَجْراً عَظِيْماً وَالصَّلاةُ وَالسَّلامُ عَلَى رَسُوْلِهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ صَلَاةً وَتَسْلِيْماً كَثِيْراً كَثِيْراً، أَمَّا بَعْد :

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আমাদের মধ্যে এমন অনেকেই আছেন যারা যিকর করেন ঠিক, কিন্তু যিকরের অর্থ বুঝেন না। ফলে তাদের অন্তর আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও তার মর্যাদা অনুধাবন থেকে বহু দূরে অবস্থান করে। অতএব হে মুসলমানগণ! আপনাদের উচিত, যিকরের অর্থ বুঝে খুব বেশি পরিমাণে যিকর করা। যাতে আপনারা কামিয়াবি অর্জন করতে পারেন। লাভ করতে পারেন পরিপূর্ণ সফলতা।

কেউ হয়তো প্রশ্ন করতে পারে যে, অন্যান্য আমলের তুলনায় যিকর এত বেশি উপকারী কেন? কেন তার মর্যাদা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এ প্রশ্নের জবাব হলো, আল্লাহ তাআলা সমস্ত ইবাদতের জন্য একটা পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন। সুনির্দিষ্ট করেছেন এগুলো আদায়ের সময়সীমা। কিন্তু যিকরের জন্য না কোনো পরিমাণ তিনি নির্ধারণ করেছেন, না কোনো সময় নির্দিষ্ট করেছেন। বরং তিনি অপরিমিতভাবে বেশি পরিমাণে যিকর করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা ঢাল লও। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! কোনো শত্রু উপস্থিত হয়েছে কি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তা নয়, বরং তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো ও জান্নাত নিশ্চিত করো। তোমরা বলো:

( سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ، وَاللَّهُ أَكْبَرُ )

কেননা কেয়ামতের দিন এ বাক্যগুলো নাজাতদানকারী হিসেবে আগে আগে আসবে এবং এগুলোই হলো, স্থায়ী সৎকাজ (হাকেম)।

স্থায়ী সৎকাজ হওয়ার অর্থ হলো, এগুলো আখেরাতের ফসল এবং এর ছাওয়াব আখেরাতের জন্য অবশিষ্ট থাকবে।

মুসলিম শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে এবং আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য উপাস্যকে অস্বীকার করে, তার রক্ত, সম্পদ পবিত্র হয়ে যায় আর তার হিসাব আল্লাহর কাছে নির্ধারিত হয়ে যায়।

প্রতিটি মুসলমানের একথা জেনে রাখা উচিত যে, হুযূরে কলব তথা আল্লাহর স্মরণে জাগ্রত হৃদয় নিয়ে নিয়মিতভাবে যে যিকর করা হয় সেই যিকরই হলো সবচেয়ে উপকারী যিকর। আর অমনোযোগ ও অন্যমনষ্ক হয়ে যিকর করার দ্বারা খুব একটা ফায়দা হয় না। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

( اعْلَمُوْا أَنَّ اللهَ لَا يَقْبَلُ الدُّعَاءَ مِنْ قَلْبٍ لَاهٍ )

‘আর তোমরা জেনে রাখো যে, আল্লাহ তাআলা অমনোযোগী অন্তরের দু‘আ কবুল করেন না’ (তিরমিযী, হাকেম)।

অন্য এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,‘যখন কোনো কওম এমন কোনো মজলিস থেকে উঠে আসে যে মজলিসে আল্লাহর যিকর করা হয়নি তারা যেন মৃত গাধার পাশ থেকে উঠে এল। (কিয়ামতের দিন) এই মজলিস তাদের জন্য আফসোসের কারণ হবে’(আবু দাউদ, হাকেম)।

যে মসলিসে বেহুদা ও অনর্থক কথাবার্তা বলা হয়, শুধু দুনিয়াবী আলোচনা করা হয় এবং আল্লাহর যিকর করা হয় না, সেই মজলিসকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুবই অপছন্দ করতেন এবং এ ধরনের মজলিসে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত থাকার জন্য তিনি নির্দেশ দিতেন। এতদসত্ত্বেও কেউ যদি এ ধরনের কোনো মজলিসে উপস্থিত হয়ে যায়, তার ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

( مَنْ جَلَسَ فِيْ مَجْلِسٍ فَكَثُرَ فِيْهِ لَغَطُهُ فَقَالَ قَبْلَ أَنْ يَقُوْمَ مِنْ مَجْلِسِهِ ذَالِكَ : سُبْحَانَكَ اللَهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ. إِلَّا كَفَّرَ اللهُ لَهُ مَا كَانَ فِيْ مَجْلِسِهِ ذَالِكَ. )

‘কেউ যদি এমন কোনো মজলিসে বসে যেখানে বেশী পরিমাণে বেহুদা কথাবার্তা বলা হয় আর সে ওই মজলিস থেকে উঠে যাওয়ার পূর্বে বলে,

( سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ )

‘পবিত্র মহান হে আল্লাহ, আমাদের রব, প্রশংসা আপনারই। আমি সাী দিচ্ছি যে, আপনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। আমি আপনার কাছে মা চাচ্ছি এবং আপনার কাছেই তাওবা করছি’ তাহলে আল্লাহ তাআলা তার ওই মসজলিসে যা ভুলত্র“টি ছিল তা মাফ করে দেবেন’ (তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ)।

اَللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنْ آلِ نَبِيِّكَ الطَّيِّبِيْنَ الطَّاهِرِيْنَ وَعَنْ أَزْوَاجِهِ أُمُّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَعَنِ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الْرَّاحِمِيْنَ.

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সকল প্রকার বালা-মুসীবত ও বিপদ-আপদ থেকে হিফাযত করুন। আমাদের অভাব দূর করে দিন। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকর্মে বরকত দিন। আমাদেরকে হালাল কামাই করার তাওফীক দিন।

হে দয়ালু প্রভু! আমাদের যাবতীয় পেরেশানী দূর করে দিন। আমাদের কামাই-রুজিতে বরকত দিন। আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে দীনদার, মুত্তাকী ও পরহেযগার বানিয়ে দিন।

হে পরমপ্রিয় মাওলা! দয়া করে আপনি গোটা পৃথিবীতে সুখ-শান্তির ফয়সালা করুন। প্রতিটি দেশে আপনার পছন্দনীয় শাসক নিযুক্ত করুন এবং ইসলাম ও মুসলমানদের শত্র“দের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাওফীক দিন।

أعُوْذُ بِاللهِ مِن الشَّيْطَانِ الرَّجِيْم : {أ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ }

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.