পাঠ সংক্ষেপ

মাহে রমজান কুরআন নাযিলের মাস। মাহে রমজান নেক-আমলের ছাওয়াব বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার মাস। দরজা বুলন্দ হওয়ার মাস। গুনাহ মোচন হওয়ার মাস। পদস্খলন থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মাস। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। শয়তানকে আবদ্ধ করে রাখা হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে ঈমান জাগ্রত রেখে, আল্লাহর কাছে ছাওয়াবের আশায় রোজা রাখে ও কিয়ামুল্লাইল করে, আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেন।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ اخْتَصَّ شَهْرَ رَمَضَانَ بِفَرِيْضَةِ الصِّيَامِ وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبِيَّنَا مُحَمداً عَبْدُهُ وَرَسْولُهُ صَلَّى اللهُ وَسَلَّمَ وَبَارَكَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيِنِ، أَمَّا بَعْدُ :

আল্লাহ থেকে দূরে, পাপে-অন্যায়ে

কালের শূন্য গর্ভে লীন হয়ে হয়ে

গোনাহের কালিমায় ডুবন্ত হৃদয়ে

খসে গেছে যার জীবন থেকে অজস্র ক্ষণ

রমজান তার দরজায়, নির্বাক দাঁড়িয়ে

রহমত, মাগফিরাত, মুক্তির শত আহ্বান নিয়ে।

মুহতারাম হাযেরীন! আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য রেখেছেন বড়-বড় কিছু উপলক্ষ্য, মৌসুম, যা শাণিত করে আমাদের হৃদয়ে ঈমানকে, আন্দোলিত করে অন্তরাত্মায় পবিত্র সব অনুভূতি। বাড়িয়ে দেয় আমাদের ভেতর ইবাদত-বন্দেগীর জযবা। রমজান তেমনই এক মৌসুম। রমজান মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তাআলার হাদিয়া। রমজান আমাদেরকে দেয় ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, স্বচ্ছতা, সহমর্মিতা, আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা,পবিত্রতা, সবর ও শৌর্যবীর্যের দীক্ষা। রমজান একটি সুমিষ্ট ঝর্নাধারা। ইবাদতকারীদের জন্য নিরাপদ ক্ষেত্র, আনুগত্যকারীদের জন্য দুর্বার দুর্গ। যারা পাপী তাদের জন্য রমজান একটি বড় সুযোগ, যাতে তারা তাদের গুনাহ থেকে তাওবা করতে পারে। তাদের জীবন-ইতিহাসে স্বচ্ছ কিছু অধ্যায় রচিত করতে পারে। তাদের জীবনকে ভরে দিতে পারে উত্তম আমলে, উৎকৃষ্ট চরিত্রে।

প্রিয় মুসলী­বৃন্দ!মাহে রমজান কুরআন নাযিলের মাস। মাহে রমজান নেক-আমলের ছাওয়াব বহুগুণে বেড়ে যাওয়ার মাস। দরজা বুলন্দ হওয়ার মাস। গুনাহ মোচন হওয়ার মাস। পদস্খলন থেকে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মাস। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। শয়তানকে আবদ্ধ করে রাখা হয়। যে ব্যক্তি এ মাসে ঈমান জাগ্রত রেখে, আল্লাহর কাছে ছাওয়াবের আশায় রোজা রাখে ও কিয়ামুল্লাইল করে, আল্লাহ তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেন।

মাহে রমজান মহিমান্বিত মাস। রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস। এ মাসে উমরা আদায় হজের সমতুল্য।

আর আদমসন্তানের সকল আমলই তার নিজের, তবে মাহে রমজানের রোজা আল্লাহর। আল্লাহ নিজেই এর প্রতিদান দেবেন। হাদীসে এসেছে:

( كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِيْ وَأَنَا أَجْزِيْ بِهِ )

(আল্লাহ তাআলা বলেন)‘আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের, রোজা ছাড়া, নিশ্চয় রোজা আমার এবং আমিই এর প্রতিদান দিই’ (বুখারী)।

মুহতারাম মুসল্লিয়ান! আপনারা রমজানের চাঁদ দেখে রোজা রাখুন। চাঁদ দেখার একদিন বা দুইদিন পূর্ব থেকে রোজা রাখা শুরু করবেন না। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ করতে নিষেধ করেছেন। তবে যদি কারও গত রমজানের কাযা রোজা থেকে থাকে তবে রমজানের এক দ’ুদিন পূর্বেও আদায় করা যাবে। যদি কোনো ব্যক্তির প্রতিসপ্তাহে সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখার অভ্যাস থেকে থাকে আর রমজান শুরু হওয়ার আগের দিন সোমবার অথবা বৃহস্পতিবার হয়, তবে তার জন্যও ওই দিন রোজা রাখা বৈধ হবে।

প্রিয় ভাইয়েরা! শাবানের উনত্রিশ তারিখের সন্ধ্যায় পশ্চিম-আকাশ অস্পষ্ট থাকায় যদি চাঁদ দেখা না যায় তবে শাবানের ত্রিশ তারিখকে সন্দেহের দিন বলা হয়। এই দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ। তাই এই দিন রোজা রাখবেন না। সহীহ বুখারীতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

( لَا تَصُوْمُوْا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَأَكْمِلُوا الْعِدَّةَ ثَلَاثِيْنَ )

‘তোমরা চাঁদ না দেখে রোজা রেখো না। যদি আকাশ ঘোলাটে থাকে তবে (শাবানের) ত্রিশ দিন পূর্ণ করো’ (বুখারী)।

যদি কেউ নিশ্চিতরূপে চাঁদ দেখে তাহলে তার উচিত হবে কর্তৃপক্ষকে খবর দেয়া। আর যখন সরকারিভাবে রেডিও অথবা অন্যকোনো মিডিয়ার মাধ্যমে রমজান শুরু অথবা শেষ হওয়ার ঘোষণা দেয়া হয় তখন এ ঘোষণা অনুযায়ী আমল করাও জরুরি। কেননা এ ক্ষেত্রে সরকারি ঘোষণাই চূড়ান্ত।

শ্রোতামণ্ডলী! রমজানের রোজা ইসলামের একটি স্তম্ভ। আল্লাহর তাআলার পক্ষ থেকে ফরজ করে দেয়া একটি বিধান। তাই রমজানের রোজা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ইরশাদ হয়েছে:

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ }

‘হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর’ (সূরা: আল বাকারা:১৮৩)।

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:

{ شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ }

‘রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়েতস্বরূপ এবং হিদায়েতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে’ (সূরা আল বাকারা:১৮৫)।

সুতরাং প্রত্যেক প্রাপ্তবয়ষ্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, মুকীম, সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর রোজা রাখা ফরজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রোজা রাখা ফরজ। অমুসলিমের উপর রোজা রাখা ফরজ নয়। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুর জন্যও রোজা রাখা ফরজ নয়। তবে যদি রোজা রাখতে কষ্ট না হয় তাহলে রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে-তোলার জন্য তাদেরকে রোজা রাখার নির্দেশ দেয়া উত্তম হবে। কেননা সাহাবায়ে কিরাম রাযি. তাঁদের বাচ্চাদেরকে রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন। বাচ্চাদের কেউ ক্ষুধায় কাঁদতে শুরু করলে কোনো খেলনা দিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ভুলিয়ে রাখতেন।

মুহতারাম হাযেরীন! ছেলেদের বেলায় তিনটি আলামত পরিলক্ষিত হলে প্রাপ্তবয়স্ক বলে ধরে নেয়া হবে।

১.স্বপ্নদোষ বা অন্যকোনো কারণে বীর্যপাত হলে।

২.যৌনাঙ্গের ঊর্ধ্বভাগে কেশ দেখা দিলে।

৩.বয়স পনেরো বছর পূর্ণ হলে।

অবশ্য মেয়েদের জন্য চতুর্থ একটি আলামত রয়েছে। আর তা হলো মাসিক দেখা দেয়া। যদি দশ বছর বয়সের কিশোরীরও মাসিক দেখা দেয়, তাহলে তাকে পূর্ণবয়স্ক বলে ধরা হবে।

ছেলে বা মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে শরীয়তের সকল আদেশ-নিষেধ পালন করা আবশ্যক হয়ে পড়বে। আর এ সময় ছেলেমেয়েকে যথা নিয়মে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ মানতে বাধ্য করার মধ্যেই নিহিত ছেলেমেয়েদের প্রতি প্রকৃত আদর সোহাগ ও মায়া-মমতা করা।

যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক, অথবা পাগল, অথবা অপারগ অশীতিপর বৃদ্ধ এদের উপর রোজা রাখা ফরজ নয়। যারা স্থায়ীভাবে অপারগ যেমন বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তি, যাদের ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তারাও রোজা রাখবে না। তবে প্রতিদিনের রোজার পরিবর্তে একজন মিসকীনকে খাবার খাওয়াবে। যদি অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং রোজা রাখা তার পক্ষে কষ্ককর না হয়, অথবা ক্ষতিকর না হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে। কেননা এ অবস্থায় সে অপারগ নয়, তার কোনো উযর নেই, যার কারণে রোজা ভাঙ্গা বৈধ হবে। আর যদি এমন হয় যে রোজা রাখা তার পক্ষে কঠিন, তবে ক্ষতিকর নয়, তবে সে রোজা ভঙ্গ করবে। কেননা এ অবস্থায় রোজা রাখা তার জন্য মাকরুহ হবে। আর যদি রোজা রাখা তার জন্য ক্ষতিকর হয়, তবে সে অবশ্যই রোজা ভঙ্গ করবে কেননা এ অবস্থায় রোজা রাখা হারাম বলে বিবেচিত হবে। তবে যখন সুস্থ হবে তখন বিগত রোজাগুলো কাযা করে নিবে। আর যদি সুস্থ হওয়ার আগেই মারা যায় তবে সে দায়মুক্ত থাকবে।

গর্ভবতী নারীর পক্ষে রোজা রাখা কষ্টকর হলে রোজা ভাঙ্গা বৈধ হবে। পরবর্তীকালে, গর্ভাবস্থায় অথবা সন্তান প্রসবের পর, যখন সহজ বলে মনে হবে তখন রোজাগুলো কাযা করে নিবে। দুগ্ধদানকারী মহিলারও যদি দুগ্ধদান করার কারণে কষ্ট হয়, অথবা রোজা রাখার ফলে দুধ কমে গিয়ে সন্তানের খাদ্য ঘাটতি ঘটে, এমতাবস্থায় রোজা ভঙ্গের অনুমতি রয়েছে। তবে পরবর্তীকালে তাকে এ রোজাগুলো রাখতে হবে।

মুসাফির ব্যক্তির জন্য যদি রোজা রাখা সহজ হয় তাহলে সে রোজা রাখবে। আর যদি রোজা রাখা সহজ না হয়, তাহলে রোজা ভঙ্গ করবে। পক্ষান্তরে যদি এমন হয় যে, রোজা রাখা না রাখা উভয়টাই তার জন্য সমান, তাহলে রোজা রাখাটাই উত্তম বলে গণ্য হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আমল দ্বারা এমনটাই প্রমাণিত। উপরন্তু যদি রোজা রেখে থাকে, তাহলে রোজা রাখার দায়িত্ব থেকেও অব্যাহতি পাওয়া গেল। আর মাহে রমজানের ফযীলত ও বরকতও পাওয়া গেল।

যদি সফরের কারণে রোজা রাখা কষ্টকর হয়, তাহলে রোজা রাখা মাকরুহ হবে। কষ্ট যদি অতিরিক্ত হয়, তাহলে রোজা রাখা হারাম হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কা বিজয়ের বছর রমজান মাসে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। এ সময় তিনি রোজা অবস্থায় ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলা হল যে, রোজা রেখে মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনি কি করেন তার দিকে মানুষ চেয়ে আছে। অতঃ

পর আসরের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক পেয়ালা পানি তলব করলেন। তিনি তা উর্ধ্বে ওঠালেন যাতে মানুষ দেখতে পারে। অতঃপর তিনি তা পান করলেন আর লোকজন তাঁর দিকে তাঁকিয়ে ছিল। এরপর তাঁকে বলা হলো যে, কিছু লোক রোজা রেখেই চলেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওরা অবাধ্য, ওরা অবাধ্য (মুসলিম)।

যে ব্যক্তি রোজা রাখা অবস্থায় দিনের বেলায় সফর করে তার জন্য উচিত ওই দিনের রোজা পূর্ণ করা। আর যদি পূর্ণ করা কষ্টকর হয় তবে রোজা ভঙ্গ করবে এবং পরবর্তী সময়ে কাজা করবে।

হায়েয ও নেফাসগ্রস্ত মহিলারা রোজা রাখবে না, তবে যদি সেহরির সময় শেষ হওয়ার সামান্য আগেই পবিত্রতা অর্জন করে, তবে সেদিন অবশ্যই রোজা রাখবে। তবে হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত মহিলাদের যেসব রোজা ভাঙ্গা পড়বে তা কাযা করে নিতে হবে।

বেরাদারানে ইসলাম! মাহে রমজানে তারাবীর নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাহে রমজানে কিয়ামুল্লাইল অর্থাৎ ইবাদতের মাধ্যমে রাত্রিযাপনের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন:

( مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيْمَاناً وَاحْتِسَاباً غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ )

‘যে ব্যক্তি রমজানে ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কিয়ামুল্লাইল করবে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে’ (বুখারী ও মুসলিম)।

আর তারাবীর নামাজ হলো কিয়ামুল্লাইলেরই একটি অংশ। তাই আসুন, আমরা এই নামাজ যথার্থরূপে আদায় করি। সুন্দরভাবে আদায় করি। ইমাম যতক্ষণ থাকেন ততক্ষণ আমরাও তার পেছনে থাকি। কেননা যে ব্যক্তি ইমাম প্র্রস্থান করা পর্যন্ত তার সাথে কিয়ামুল্লাইল করল, তার আমলনামায় পূর্ণ রাত্রিযাপনের ছাওয়াব লিখা হল, যদিও সে পরে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে থাকে।

যারা ইমাম তাদেরকে এ ব্যাপারে যথেষ্ঠ সচেতন হতে হবে। যারা তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের ব্যাপারে ইমামদের গুরুত্ব দিতে হবে। অতঃপর তারাবীর নামাজ যেন সুন্দরভাবে আদায় হয় সেদিকে তাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তারাবীর নামাজে ধীরস্থিরতা বজায় রাখতে হবে। দ্রুত তারাবীহ শেষ করে অব্যাহতি নেয়ার প্রবণতা থেকে ইমাম সাহেবদেরকে মুক্ত হতে হবে। কেননা এরূপ করলে নিজকে ও যারা তার পেছনে রয়েছে সবাইকে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হবে। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের সুন্দর আমল দেখতে চান, দ্রুত আমল অথবা অসুন্দর অধিক আমল দেখার কথা কোথাও লেখা নেই।

أَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ: {الَّذِي خَلَقَ الْمَوْتَ وَالْحَيَاةَ لِيَبْلُوَكُمْ أَيُّكُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا وَهُوَ الْعَزِيزُ الْغَفُورُ} (سورة الملك:2)

أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ لِي وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوْهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الْرَّحِيْمُ

اَلْحَمْدُ اللهِ الَّذِي اخْتَارَ لِلْخَيْرَاتِ أَوْقَاتاً وَأَيَّاماً، أَحْمَدُهُ سُبْحَانَهُ وَأَشْكُرُهُ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، كَتَبَ الْمَغْفِرةَ لِمَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَاناً وَاحْتِسَاباً، وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبَيِّنَا مُحَمَداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ صَلَّى اللهُ وَسَلَّمَ وَبَارَكَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعَينَ لَهُمْ بِإحْسَانٍ إَلَى يَوْمِ الدِّينِ أَمَّا بَعْدُ:

মুসল্লিয়ানে কেরাম! আল্লাহ তাআলার সকল বিধানেই রয়েছে বহুমুখী কল্যাণ। মাহে রমজানের সিয়াম সাধনা, দিনের বেলায় খানাপিনা ও কাম প্রবৃত্তিকে দমনের মধ্যেও আল্লাহ তাআলা নিহিত রেখেছেন নানাবিধ কল্যাণ। দুনিয়া ও আখেরাতের কামিয়াবি। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:

এক. শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির ক্ষমতা দুর্বল করা: রক্তমাংশের চাহিদা পূরণের জন্য রীতিমতো খাদ্য, পানীয় গ্রহণ ও যৌনসম্ভোগ চরিতার্থকরণ কুপ্রবৃত্তিকে বেপরওয়া করে তোলে, উদ্ধত করে তোলে। কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় মানুষ সকল প্রকারের পাপাচারে লিপ্ত হয়। তাই কুপ্রবৃত্তিকে দুর্বল করার জন্য রোজার কোনো বিকল্প নেই।

দুই. যিকর ও ফিকিরের জন্য অন্তর খালি করা: কেননা প্রবৃত্তির চাহিদা প্রতিনিয়ত পুরণ করে যাওয়ায় হৃদয়ে একপ্রকার অন্ধত্ব চলে আসে। হৃদয় শক্ত হয়ে যায়। এর বিপরীতে ক্ষুধা ও পিপাসা মানুষের অন্তরকে আলোকিত করে, নরম করে। হৃদয়ের কঠিন অবস্থা দূর করে হৃদয়কে বিনম্র করে দেয়। যিকর ও ফিকিরের জন্য হৃদয়কে খালি করে দেয়।

তিন. রোজার মাধ্যমে ধনী ব্যক্তিরা আল্লাহর নেয়ামতের কদর ও মূল্য বুঝতে সক্ষম হয়। আল্লাহর অনুগ্রহের কথা বুঝতে সক্ষম হয়। কেননা অনুগ্রহ ও নেয়ামতের মূল্যায়ন মানুষ তখনই করতে শেখে যখন তা হারিয়ে যায়। রোজার দিনে খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত রেখে এই নেয়ামত হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলা হয়। পাশাপাশি রোজা রাখার মাধ্যমে অভাবী ও বঞ্চিত মানুষের দুরাবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়।

চার. রোজা মানুষের শিরা-উপশিরাকে সঙ্কুচিত করে। আর এ শিরা-উপশিরা শয়তানের প্রবেশ ও চলাচলের পথ। রোজার মাধ্যমে শয়তানের ওয়াসওয়াসা স্তিমিত হয়, যৌনপ্রবৃত্তির আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে। এ কারণেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজাকে যৌনপ্রবৃত্তির দমনকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

{ ‏يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنْ اسْتَطَاعَ مِنْكُمْ ‏ ‏الْبَاءَةَ ‏ ‏فَلْيَتَزَوَّجْ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ ‏ ‏وِجَاءٌ ‏ }

‘হে যুবকেরা! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা বিবাহ দৃষ্টি অবনত রাখে ও লজ্জাস্থানের সুরক্ষা দেয়। আর যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে না সে যেন রোজা রাখে। কারণ এটা তার যৌনপ্রবৃত্তিকে দমনকারী’ (বুখারী)

মুহতারাম হাযেরীন! কেবল বৈধ-পানাহার ও যৌনসম্ভোগ থেকে দিনের বেলায় বিরত থাকলেই রোজার হক আদায় হয়ে যাবে না বরং এর সাথে প্রয়োজন রয়েছে সকল হারাম ও অবৈধ কাজ থেকে সর্বাবস্থায় বিরত থাকার। আল্লাহ তাআলা যা কিছু হারাম করেছেন তা সর্বাবস্থায় বর্জন করে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকে জীবনের অন্যতম উদ্দেশ্য হিসেবে নিতে হবে। যেমন মিথ্যা, যুলম-অন্যায়, মানুষের জান-মাল ও মান-ইজ্জতের উপর চড়াও হওয়া ইত্যাদি থেকে সকল অবস্থায় বিরত থাকতে হবে। হাদীসে এসেছে:

{مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ ‏ ‏الزُّورِ ‏ ‏وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ لِلَّهِ حَاجَةٌ فِي أَنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ }

‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ বর্জন করল না, সে তার খাদ্য ও পানীয় বর্জন করুক, এতে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই’ (বুখারী)

জাবের রাযি. বলেন: ‘তুমি যখন রোজা রাখবে তখন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বা যেন মিথ্যা ও হারাম থেকে রোজা রাখে। তুমি প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া বর্জন করো, রোজার দিনে যেন তোমার উপর শান্তশিষ্ট ও গাম্ভীর্যের ভাব ছেয়ে থাকে। আর তোমার রোজা রাখার দিন ও না রাখার দিন যেন সমান না হয়’।

সালাফে সালেহীনদের ব্যাপারে এমনও বর্ণিত আছে যে, রোজা রাখা অবস্থায় তারা মসজিদে বসে থাকতেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল: আমরা এভাবে আমাদের রোজাকে হিফাযত করি, আর কারও গীবত করি না।

মুসল্লিয়ানে কেরাম! রমজান মাস কুরআনের মাস। ইবনে আব্বাস রাযি. এর বর্ণনা অনুযায়ী এ মাসে বায়তুল-ইজ্জত থেকে পুরো কুরআন লাওহে মাহফুজে অবতীর্ণ হয়েছে কদরের রাতে। মাহে রমজান সমাগত হলে ইমাম যুহরী রহ. বলতেন:

‘এটা তো কুরআন তিলাওয়াত আর খাবার খাওয়ানোর মাস’। ইবনে আবদুল হাকীম রহ. বলেন: রমজান এলে ইমাম মালিক রহ. হাদীসের পাঠ ও আহলে ইলমের সাথে বৈঠক করা থেকে পালিয়ে যেতেন। কুরআন খুলে তিনি তিলওয়াতে মশগুল হতেন।

প্রিয় মুসল্লিয়ানে কিরাম! রমজান মাস রাত-দিন মুজাহাদার মাস। দিনের বেলায় রোজা ও রোজাদারসুলভ চরিত্র আঁকড়ে ধরা এবং রাতের বেলায় নামাজের মাধ্যমে মুজাহাদা করা। সালেহ-নেককার ব্যক্তিদের সাদৃশ্য অবলম্বনের জন্য সচেষ্ট হওয়া। উমর রাযি. উবাই ইবনে কাব ও তামীম আদ-দারী রাযিয়াল্লাহু আনহুমাকে রমজান মাসে ইমামতি করতে বলতেন। কুরআন তিলাওয়াতকারী এক রাকা‘আতে দুইশত আয়াত পর্যন্ত তিলাওয়াত করে ফেলতেন। এমনকী তাঁরা দীর্ঘসময় কিয়ামের ফলে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়াতেন। সুবহে সাদেক নিকটবর্তী হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁরা যেতেন না।

রমজান মাস বেশি বেশি দান খয়রাত করার মাস। ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে এক বর্ণনায় এসেছে:

( كَانَ رَسُولُ اللَّهِ أَجْوَدَ النَّاسِ، وَكَانَ أَجْوَدَ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ )

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচে’ বেশি দানশীল। আর রমজানে তার বদান্যতা আরো বেড়ে যেত’ ( বুখারী)।

রমজন মাসে সকল নেক-আমলের ছাওয়াব বেড়ে যায়। তাই দান-খয়রাতের ছাওয়াবও বেড়ে যায়। রমজান মাসে দান খয়রাতের মাধ্যমে রোজাদার, যিকরকারী ও রাত্রিযাপনকারীদেরকে সাহায্য করা হয়।

উপরন্তু রোজা ও সদকা একত্রিত হওয়া গোনাহের মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অধিক কার্যকরী। আবুদ-দারদা রাযি. বলেন:

(صَلُّوْا فيْ ظُلْمَةِ اللَّيْلِ رَكْعَتَيْنِ لِظُلْمَةِ الْقُبُوْرِ، صُوْمُوا يَوْماً شَدِيْداً حَرُّهُ لِحَرِّ يَوْمِ النُّشُوْرِ، تَصَدَّقُوْا بِصَدَقَةٍ لِشَرِّ يَوْمٍ عَسَيْرٍ )

‘তোমরা কবরের আঁধার থেকে বাঁচার জন্য রাতের আঁধারে দু’রাকাআত নামাজ পড়ো। কিয়ামত দিবসের গরম থেকে বাঁচার জন্য প্রচণ্ড গরমের দিনে রোজা রাখো। আর কঠিন দিনের অকল্যাণ থেকে বাঁচার জন্য তোমরা সদকা করো’।

আর রোজার মধ্যে ভুলত্রুটি হওয়া স্বাভাবিক। সদকা সেসব ভুলত্রুটি শুধরিয়ে রোজাকে পরিশুদ্ধ করে দেয়।

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

হে আল্লাহ! রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির মাস মাহে রমজান, এ মাসে আপনি আমাদের সবাইকে মাফ করে দিন। আপনি আমাদের জানা-অজানা সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন। আপনি যথার্থরূপে আমাদেরকে সিয়াম সাধনার তাওফীক দান করুন। এই পবিত্র মাসে আপনি আমাদেরকে ছোট-বড় সকল পাপ থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আমাদের রোজা যেন শুধুই ক্ষুধা ও পিপাসার নামান্তর না হয় সে তাওফীক দান করুন। আপনি আমাদেরকে যথার্থরূপে কিয়ামুল্লাইল করার তাওফীক দান করুন। কুরআনের মাসে আপনি আমাদের সবাইকে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতের তাওফীক দান করুন। আমরা যেন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কুরআনুল কারীমের অনুসরণ করতে পারি সে তাওফীক দান করুন। এই পবিত্র মাসে মুসলিম উম্মাহ্র উপর আপনি রহমত বর্ষণ করুন। বিশ্বের সকল মুসলমানকে আপনি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের তাওফীক দান করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله :(إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.