পাঠ সংক্ষেপ

আল্লাহ তাআলা রমজান মাসের শেষের দিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইবাদত বিধিবদ্ধ করেছেন, যা বাস্তবায়নে ঈমান বৃদ্ধি পায়, ইবাদত-বন্দেগী পূর্ণতা পায় এবং নেয়ামত পরিপূর্ণতা লাভ করে। আল্লাহ তাআলা এ মাসে আমাদের জন্য সদকায়ে ফিতর, তাকবীর এবং ঈদের নামাজ শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এজন্য আমরা আল্লাহ তাআলার হামদ ও ছানা এবং শুকরিয়া আদায় করি। এসব কাজের মধ্যে একটি হল সদকাতুল ফিতর। সদকায়ে ফিতর রোজাদারের অনর্থক, অশ্লীল কথা ও কাজ পরিশুদ্ধকারী এবং এতে রয়েছে অভাবী মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা। রমজানের রোজা শেষ করার ফলে যে সদকা ওয়াজিব হয়, তাকেই সদকায়ে ফিতর বলে। সদকায়ে ফিতর মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ করুণা। রোজা পালনের সময় যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হয় তা পুষিয়ে দেয়ার জন্য সদকায়ে ফিতরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الْبَرِّ الْجَوَادِ الْكَرِيْمِ، الْقَابِضِ الْبَاسِطِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ، أَحْمَدُهُ تَعَالَى عَلَى فَضْلِهِ الْعَظِيْمِ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، أَمَرَنَا بِصِلَةِ الْأَرْحَامِ، وَالصَّدَقَةِ عَلَى الْفُقَرَاءِ وَالْأَيْتَامِ، وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبِيَّنَا مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسْولُهُ صَلَّى اللهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيِنِ. أَمَّا بَعْدُ :

যা রাখি সবার তরে সেই শুধু রবে,

মোর সাথে ডোবে না সে, রাখে তারে সবে।

প্রিয় উপস্থিতি! মাহে রমজান এসেছিল মেহমান হয়ে, অনেক সওগাত নিয়ে। এখন সে বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার উপক্রম করেছে দীর্ঘ এগার মাসের জন্য। আমরা এ মেহমানের আতিথিয়েতায় কতটুকু সফল হলাম তা ভেবে দেখা উচিত।

অতএব, আসুন আমরা রমজানের বাকী দিনগুলোতে তওবা, ইস্তেগফার করি। আল্লাহর কাছে মা চাই। বেশি বেশি সৎকর্ম ও নেক-আমল করি। মহান আল্লাহর কাছে কাকুতি মিনতি ও অনুনয় বিনয় করি। আশা করা যায়, আল্লাহ তাআলা আপনার আমার যাবতীয় সীমালংঘন ও ত্রুটিবিচ্যুতি মোচন করে দিবেন। অপূর্ণতাকে পূর্ণ করে দেবেন।

প্রিয় শ্রোতামণ্ডলী! আল্লাহ তাআলা এ মাসের শেষের দিকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ইবাদত বিধিবদ্ধ করেছেন, যা বাস্তবায়নে ঈমান বৃদ্ধি পায়, ইবাদত-বন্দেগী পূর্ণতা পায় এবং নেয়ামত পরিপূর্ণতা লাভ করে।

আল্লাহ তাআলা এ মাসে আমাদের জন্য সদকায়ে ফিতর, তাকবীর এবং ঈদের নামাজ শরীয়তের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এজন্য আমরা আল্লাহ তাআলার হামদ ও ছানা এবং শুকরিয়া আদায় করি।

এসব কাজের মধ্যে একটি হল সদকাতুল ফিতর। সদকায়ে ফিতর রোজাদারের অনর্থক, অশ্লীল কথা ও কাজ পরিশুদ্ধকারী এবং এতে রয়েছে অভাবী মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থা।

রমজানের রোজা শেষ করার ফলে যে সদকা ওয়াজিব হয়, তাকেই সদকায়ে ফিতর বলে। সদকায়ে ফিতর মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ করুণা। রোজা পালনের সময় যেসব ত্রুটি-বিচ্যুতি সংঘটিত হয় তা পুষিয়ে দেয়ার জন্য সদকায়ে ফিতরের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

সকালে সুবহে সাদিকের সময় যে ব্যক্তি জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশ্যকীয় উপকরণ যথা পরিধেয় বস্ত্র, থাকার ঘর এবং আহার্য দ্রব্যাদি ছাড়া নেসাব পরিমাণ যেকোনো সম্পদের মালিক থাকবে, সদকায়ে ফিতর তার উপরই ওয়াজিব। জামহূর ফুকাহার মতানুযায়ী যে ব্যক্তি ঈদের দিন পরিবারের এক দিন এক রাতের খাবারের অতিরিক্ত এক সা‘ পরিমাণ খাদ্যের মালিক থাকবে তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব।

সদকায়ে ফিতর শরীয়তের বিধানভুক্ত হওয়ার বিষয়টি আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। তিনি বলেন:

( فَرَضَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ مِنْ رَمَضَانَ، صَاعاً مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعاً مِنْ شَعِيْرٍ )

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান শেষে সদকায়ে ফিতর এক সা‘ খেজুর অথবা এক সা‘ যব নির্ধারণ করেছেন’ (মুসলিম)।

শরীয়তে সদকায়ে ফিতর বিধিবদ্ধ হওয়ার দুটি হেকমত রয়েছে। প্রথম হেকমতটি হল, রোজাদারের রোজাকে পবিত্র বা কলুষমুক্ত করা। কোনো রোজাদার যখন রোজা রাখা অবস্থায় বেহুদা কোনো কাজকর্ম করে কিংবা কোনো গুনাহের কাজে লিপ্ত হয় তখন তার জন্য এটা জরুরী হয়ে পড়ে যে, সে তার ঐ রোজাকে এসব কদর্যতা থেকে পবিত্র করবে। সদকায়ে ফিতর দ্বারা প্রথমত গুরুত্বপূর্ণ এ কাজটি সম্পন্ন হয়ে থাকে।

এদিকে ইশারা করেই আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজাদারের জন্য সদকাতুল ফিতর আদায় অপরিহার্য করে দিয়েছেন, যা সিয়াম পালনকারীর অনর্থক ও অশ্লীল কথা-কাজ পরিশুদ্ধকারী এবং অভাবী মানুষের জন্য আহারের ব্যবস্থাকারী। অতএব যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পূর্বে তা আদায় করবে তা সদকাতুল ফিতর হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। আর যে ঈদের নামাজের পর আদায় করবে তা অপরাপর (নফল) সদকা হিসেবে গণ্য হবে (আবু দাউদ)।

সদকায়ে ফিতরের দ্বিতীয় হেকমত হলো, এতীম-অসহায়, অভাবী ও নিঃস্ব মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা। ঈদের দিন গরীব-মিসকীনদের যেন ধনীদের কাছে হাত পাততে না হয় এবং তারাও যেন ধনীদের আনন্দের সাথে আনন্দে মেতে উঠতে পারে, সেজন্যই শরীয়তে সদকায়ে ফিতরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বস্তুতঃ সদকায়ে ফিতর দ্বারা অভাবী মানুষের অভাবের যন্ত্রণা ও দুঃখ-কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব হয়।

সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হওয়ার শর্তাবলী: সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো মুসলমান হওয়া। কোনো অমুসলিমের উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব নয়। যদি কোনো কাফিরের এমন কিছু মুসলমান আত্মীয়-স্বজন থাকে যাদের ভরণ-পোষণ সে করে থাকে তথাপি তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে না। কেননা সদকা একটি ইবাদত। যা কোনো অমুসলমানের উপর ওয়াজিব হয় না।

সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হওয়ার দ্বিতীয় শর্ত হলো, নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া। ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর মতানুযায়ী সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রৌপ্য কিংবা এই দু’টির কোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ অন্যকোনো সম্পদের মালিক হওয়া। আর জামহূর ফুকাহার মতানুযায়ী, ঈদের দিন নিজের ও পরিবারের এক দিন এক রাতের খরচ বাদে অতিরিক্ত এক সা‘ পরিমাণ খাদ্যের মালিক হওয়া। যার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব সে নিজের পক্ষ্য থেকে এবং পোষ্যদের পক্ষ্য থেকেও তা আদায় করবে।

সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হওয়ার তৃতীয় শর্ত হলো, ওয়াক্ত বা সময় হওয়া। আর তা হলো, ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পর। অবশ্য জামহূর উলামায়ে কিরাম বলেন, সদকায়ে ফিতর আদায় করার সময়টি রমজান মাস শেষ হওয়ার সাথে সাথেই শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ রমজানের শেষ দিন সূর্য অস্ত যাওয়ার পর থেকে।

সদকায়ে ফিতর ঈদের নামাজের পূর্বেই আদায় করে শেষ করতে হবে। নামাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যদি কেউ আদায় করে তবে তা সাধারণ সদকা হিসেবে গণ্য হবে। সদকায়ে ফিতর হিসেবে নয়।

কোনো ব্যক্তি যদি নিজের ভরণ-পোষণ নিজেই করতে সম হয়, তাহলে সে নিজের সদকায়ে ফিতর নিজেই আদায় করবে। অনুরূপভাবে তাদেরও সদকায়ে ফিতর সে আদায় করবে যাদের ভরণ-পোষণ করা তার উপর ওয়াজিব। যেমন, স্ত্রী, মাতা, ছেলে-মেয়ে, চাকর-বাকর প্রভৃতি যদিও ছেলে-মেয়েরা ছোট হওয়ার কারণে রোজা রাখতে সম না হয়।

হাদীস শরীফে এ কথার সমর্থন রয়েছে। যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

ابْدَأْ بِنَفْسِكَ ثُمَّ بِمَنْ تَعُوْلُ

‘তুমি নিজেরটা দিয়ে শুরু করবে। তারপর যাদের ভরণ-পোষণ করো তাদেরটা দিয়ে’।

যার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে এমন ব্যক্তির যে সন্তান ঈদের দিন সুবহে সাদিকের পূর্বে জন্মগ্রহণ করে তার প থেকেও পিতাকে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হবে। আর যে সন্তান সুবহে সাদিকের পরে জন্মগ্রহণ করে, তার প থেকে পিতাকে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হবে না। তবে যদি আদায় করে দেয় তাহলে কোনো তি হবে না। এমতাবস্থায় সে নফল সদকার ছাওয়াব পাবে।

যে ব্যক্তি কোনো কারণে রোজা রাখতে পারে না তার উপরও সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। আর যারা রাখে তাদের উপরও ওয়াজিব। উভয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

সদকায়ে ফিতর গম, গমের আটা বা গমের ছাতু, যব, চাউল, খেজুর দ্বারা আদায় করা যায়। এগুলো দিয়ে আদায় করলে এক সা‘ পরিমাণ দিতে হবে। এক সা*তে দু’কেজি চল্লিশ গ্রাম হয়ে থাকে।

প্রিয় ভাইয়েরা! সদকায়ে ফিতর আদায় করুন। সদকায়ে ফিতরের সামান্য জিনিস আপনার কাছে থেকে গেলে তা আপনার ধন-সম্পদকে বাড়াবে না। আপনার বিলাসিতায়ও নতুন মাত্রা যোগ করবে না। মনে রাখবেন-

মঙ্গল করবার শক্তিই ধন

বিলাস ধন নয়

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলের রোজা কবুল ও মনযুর করুন। আমাদের সদকাতুল ফিতর কবুল করুন।

أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللَّهَ لِي وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوْهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الْرَّحِيْمُ

اَلْحَمْدُ للِّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ، أَحْمَدُهُ سُبْحَانَهُ وَأَشْكُرُهُ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ نَبِيَّنَا مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوُلُهُ صَلَّى اللهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ، أَمَّا بَعْدُ :

মুহতারাম হাযেরীন! মহান আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে দুইটি বরকতময় ঈদ দান করেছেন, যার প্রত্যেকটি আগমন করে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও ইসলামের রুকনসমূহ থেকে একটি রুকন আদায় করার পর। কল্যাণময় এই দুই ঈদে একদিকে যেমন নানাবিধ উপকারিতা ও ভালাই রয়েছে তেমনি অন্যদিকে রয়েছে জাহেলী যুগের আনন্দ উৎসবের পরিবর্তে উত্তম বদলা।

আনাস রাযি.বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় আসেন তখন মুশরিকদের জন্য বছরের দুটি দিন নির্ধারিত ছিল। তারা এ দিন দু’টোতে খেলাধূলা করত। আনন্দ করত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, এ দুটো দিন কী? সাহাবীগণ জবাবে বললেন, আমরা জাহেলী যুগে এসব দিনে খেলাধূলা ও আনন্দফূর্তি করতাম। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:

( إِنَّ اللهَ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا يَوْمَيْنِ خَيْراً مِنْهُمَا: يَوْمَ الْفِطْرِ وَيَوْمَ الْأَضْحَىْ )

‘আল্লাহ তাআলা এ দিন দু’টোকে উত্তম দুইটি দিন দ্বারা পরিবর্তন করে দিয়েছেন। তন্মধ্যে একটি হলো ঈদুল ফিতর, অন্যটি হলো, ঈদুল আযহা’ (আবু দাউদ, নাসাঈ)।

সুপ্রিয় মুসল্লীবৃন্দ! ঈদ বা আনন্দ-উৎসবের দিন আগেও ছিল এখনও আছে। তবে শরীয়ত সমর্থিত ঈদ বা উৎসব দ্বারা আল্লাহ তাআলার নৈকট্য ও ছাওয়াব অর্জিত হয়। পান্তরে মানুষ কর্র্র্র্র্তৃক প্রবর্তিত উৎসবসমূহ দ্বারা কেবল ভ্রষ্টতা ও গোমরাহীই বেড়ে চলে।

শরীয়ত সমর্থিত ঈদগুলো হলো, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা, জুমআ। এগুলো ছাড়া যত ঈদ আছে সবই জাহেলী ঈদ, যা মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট করে। যেমন- ঈদে মিলাদুন্নবী।

শরীয়ত প্রবর্তিত ঈদ তৎপর্যে ঘেরা। এতে অসংখ্য উপকারিতা ও হেকমত নিহিত আছে। ঈদ ইসলামের স্বচ্ছ ও নির্মল আকীদা-বিশ্বাসের ধারক-বাহক, যা যে কোনো মানুষের জন্য অনেক বড় নেয়ামত।

ঈদ তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার কারণ হলো, এর দ্বারা আল্লাহ তাআলার মহত্ব ও বড়ত্ব প্রকাশ করা হয় এবং তাঁর গুণাবলী বর্ণনা করা হয়। সেই সাথে এ স্যা দেওয়া হয় যে, তিনিই প্রকৃত মাবুদ- সমস্ত মুসলমান দু‘আ, আশা এবং সাহায্য প্রার্থনাসহ সকল ইবাদতের মাধ্যমে যার নৈকট্য লাভ করে। ইবাদতের ক্ষেত্রে কেউ তার সাথে কাউকে শরীক সাবস্ত করে না। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

( وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلاَ تَدْعُواْ مَعَ اللَّهِ أَحَداً )

‘আর নিশ্চয় মসজিদগুলো আল্লাহরই জন্য। কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না’ (সূরা আল জিন্ন: ১৮)।

ঈদ উদযাপনের দ্বারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা করতে বলেছেন তা পালন করা যা করতে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা তাঁর খবরসমূহের সত্যায়ন করা এবং তার আনীত শরীয়ত অনুযায়ী আল্লাহর ইবাদত করাসহ একথার স্যাও দেওয়া হয় যে, তিনি আল্লাহ তাআলার বান্দা ও প্রেরিত রাসূল।

ঈদ ইসলামী বিধি-বিধান বর্ণনারও একটি বড় মাধ্যম। কেননা সেদিন ইমাম সাহেব ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে আলোকপাত করে থাকেন।

ঈদ মানুষের চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে এবং তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করে। কেননা ঈদ মানুষকে ধৈর্য, সহনশীলতা ও সহমর্মিতার প্রতি উৎসাহ দেয়। সেই সাথে তা মানুষের অন্তরকে হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদি থেকে পবিত্র করে। কারণ ঈদের দিন মানেই হলো আনন্দ ও ইসলামী ভ্রাত্বত্ব রক্ষার দিন।

ঈদের নামাজের পূর্বে সদকায়ে ফিতর আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানদের পরস্পরের মাধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক উজ্জীবিত হয় এবং এর ফলে তাদের সামাজিক বন্ধনও সুদৃঢ় হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

( أَغْنُوْهُمْ فِيْ هَذَا الْيَوْمِ )

‘তোমরা ঈদের দিনে গরীবদেরকে ধনী বানাও’ (সুনানে দারে কুতনী, সহীহ)।

ঈদ ইসলামী বিধি-বিধানকে সহজ করে এবং তার মর্যাদাকে উন্নীত করে। কেননা সেদিন আল্লাহ তাআলা সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব করেছেন এবং সমস্ত হালাল খাবারকে বৈধ করেছেন যেমনটি রমজানের রোজার পূর্বে বৈধ ছিল। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন:

{ ياأَيُّهَا الَّذِينَ ءامَنُواْ لاَ تُحَرّمُواْ طَيّبَاتِ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكُمْ وَلاَ تَعْتَدُواْ إِنَّ اللَّهَ لاَ يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ وَكُلُواْ مِمَّا رَزَقَكُمُ اللَّهُ حَلَالاً طَيّباً وَاتَّقُواْ اللَّهَ الَّذِى أَنتُم بِهِ مُؤْمِنُونَ }

‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ যা হালাল করেছেন সেগুলোকে তোমরা হারাম করো না এবং সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না। আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যেসব হালাল ও পবিত্র রিযক দিয়েছেন তা থেকে তোমরা খাও এবং আল্লাহকে ভয় করো, যার প্রতি তোমরা মুমিন’ ( সূরা আল মায়িদা:৮৭)।

রমজান মাস সমাপ্ত হওয়ার পর আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য তাকবীর পাঠ করার বিধান দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন:

{ وَلِتُكْمِلُواْ الْعِدَّةَ وَلِتُكَبّرُواْ اللَّهَ عَلَى مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُون }

‘যাতে তোমরা গণনা পূর্ণ করো এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুণ আল্লাহ তাআলার মহত্ব বর্ণনা করো যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো’ (সূরা বাকারা: ১৮৫)।

ঈদের দিন পুরুষগণ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে সুগন্ধী মেখে উত্তম পোশাক পরিধান করে বের হবে। নতুন কাপড় অত্যাবশ্যকীয় নয়। তবে তাদের জন্য রেশমী পোশাক পরিধান করা এবং স্বর্ণালঙ্কার ব্যবহার করা জায়েয নেই। কেননা তা পুরুষদের জন্য হারাম।

ঈদুল ফিতরের দিনে করণীয়-

১. ঈদের দিন গোসল করার মাধ্যমে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা সুন্নত। কেননা এ দিন সকল মানুষ সালাত আদয়ের জন্য মিলিত হয়। যে কারণে জুমার দিনে গোসল করা সুন্নত সে কারণেই ঈদের দিন ঈদের সালাতের পূর্বে গোসল করাও সুন্নত। ইবনে উমর রাযি. সম্পর্কে এক বর্ণনায় এসেছে:

صَحَّ عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّهُ كَانَ يَغْتَسِلُ يَوْمَ الْفِطْرِ قَبْلَ أَنْ يَغْدُوَ إِلَى الْمُصَلَّى

‘ইবনে উমর রাযি. থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত যে, তিনি ঈদগাহে বের হওয়ার পূর্বে গোসল করে নিতেন’ (বর্ণনায় ঈমাম মালেক)।

২. ঈদের নামাজের জন্য বের হওয়ার আগে কিছু খাওয়া। আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

( كَانَ رَسُوْلُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لايَغُدُو يَوْمَ الْفِطْرِ حَتَّى يَأْكُلَ تَمَرَاتٍ، وَيَأْكُلُهُنَّ وِتْراً )

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতরের দিন খেজুর না খেয়ে বের হতেন না, আর তিনি খেজুর খেতেন বে-জোড় সংখ্যক’ (বুখারী)।

৩. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব রহ. বলেন :

( سُنَّةَ الْفِطْرِ ثَلَاثٌ: الْمَشْيُ إِلَى الْمُصَلَّى، وَالْأَكْلُ قَبْلَ الْخُرُوْجِ وَالاغْتِسَالُ )

‘ঈদুল ফিতরের সুন্নত তিনটি: ১. ঈদগাহে পায়ে হঁটে যাওয়া ২. বের হওয়ার পূর্বে খাওয়া ৩. গোসল করা।

৪. এক পথে ঈদগাহে গমন ও অন্যপথে ফিরে আসা। হাদীসে এসেছে :

( كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا كَانَ يَوْمُ عِيدٍ خَالَفَ الطَّرِيقَ )

‘নবী করীম সা. ঈদের দিনে আসা ও যাওয়ার পথ পরিবর্তন করতেন’ (বুখারী)।

৫. ঈদের নামাজ ঈদগাহে গিয়ে পড়া। অর্থাৎ বিনা ওজরে শহরের কোনো মসজিদে ঈদের নামাজ না পড়া। হাদীসে এসেছে :

( كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْرُجُ يَوْمَ الْفِطْرِ وَالْأَضْحَى إِلَى الْمُصَلَّى )

‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিন ঈদগাহের উদ্দেশ্যে বের হতেন’ (বুখারী)।

৭. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া। হাদীসে এসেছে :

( عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: مِنْ السُّنَّةِ أَنْ تَخْرُجَ إِلَىَ الْعِيْدِ مَاشِياً )

‘আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,‘ সুন্নত হলো ঈদের নামাজের উদ্দেশ্যে তুমি পায়ে হেঁটে যাবে’ (তিরমিযী, হাসান)

৮. ঈদগাহে যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় থেকে নামাজ পর্যন্ত তাকবীর দেয়া । তাকবীরের শব্দমালা হলো:

( اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَلِلَّهِ الْحَمْدُ)

৯. ঈদের দিন সাধ্যমতো উত্তম কাপড় পরিধান করাও সুন্নত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি বিশেষ জুব্বা ছিল, যা তিনি দুই ঈদে পরতেন (ইবনে খুযাইমা)।

১০. ঈদের দিন পরিবারের সদস্যদেরকে নিয়ে আনন্দ উৎসব করাও মুস্তাহাব। তবে তা যেন বৈধ পন্থায় এবং শরীয়তসিদ্ধভাবে হয়।

১১. ঈদের দিন সদকায়ে ফিতর দান করা। ঈদের দু’একদিন পূর্বেও সদকায়ে ফিতর দিয়ে দেয়া বৈধ।

মুহতারাম মুসল্লীবৃন্দ! ঈদ একটি পবিত্র অনুষ্ঠান। দুঃখের বিষয় আমরা এই ঈদকে অবৈধ বিনোদনে ভরিয়ে তুলি, যা কখনো মুসলমানের জন্য উচিত নয়। ঈদের দিনে যুবতী মেয়েদের দামী দামী কাপড় পরিধান করে খোলা মাথায় বেপর্দা অবস্থায় মহল্লায় মহল্লায় দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানো যেন আজ রেওয়াজ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা অভিভাবকহীন অবস্থায় চলাফেরা করে, যা একজন মুসলিমা মহিলার জন্য কোনো অবস্থাতেই উচিত নয়। এভাবে ঈদ উদযাপনে ঈদের মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টরা কঠিন গোনাহের ভাগী হচ্ছে, যার পরিণাম খুবই ভয়াবহ।

পরিশেষে বলতে চাই, ইসলাম একটি সুন্দর ও কুসংস্কার বর্জিত ধর্ম। এর প্রতিটি রীতিনীতি পালনের মধ্যে রয়েছে জীবনের সার্থকতা। তাই আমাদের উচিত, ঈদের মর্যাদা রার্থে যথাসাধ্য চেষ্টা করা এবং ঈদ উদযাপনের নামে যেসব শরীয়ত বিরোধী কাজকর্ম প্রচলিত আছে সেগুলো প্রতিরোধ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا. اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ عَلَى عَبْدِكَ وَرَسُوْلِكَ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ، وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ، وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيِنِ.

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের মাহে রমজানের সকল রোজা কবুল করুন। আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে সদকাতুল ফিতর আদায় করার তাওফীক দিন।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ঈদের পবিত্রতা রা করার তাওফীক দান করুন। ঈদের দিন যেন বিনোদনের নামে অবৈধ কাজে জড়িয়ে না পড়ি সে তাওফীক আমাদের সবাইকে দান করুন। হে আল্লাহ ভিনদেশী সংস্কৃতির সয়লাব থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন। আমাদের পরিবার পরিজনকে হিফাযত করুন। হে আল্লাহ আমাদের মা- বোনদেরকে পর্দা-পুশীদা বজায় রাখার তাওফীক দিন। হে আল্লাহ! আমাদের দেশে যারা অপসংস্কৃতি ছড়াচ্ছে তাদেরকে আপনি হিদায়েত নসীব করুন। আমাদেরকে আপনি আমর বিল মারুফ ওয়া নাহী আনিল মুনকারের দায়িত্ব পালনের তাওফীক দিন। আপনি আমাদের প্রত্যেককে দীনের আহবানকারী বানান।

হে আল্লাহ! মুসলিম উম্মাহ্কে আপনি হিফাযত করুন। মুসলিমদেশসমূহকে আপনি শত্র“মুক্ত করুন। সমস্ত পৃথিবীর মুসলমানদেরকে আপনি দীনদার পরহেজগার বানিয়ে দিন। মুসলমানদেরকে আপনি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের তাওফীক দান করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের দেশের উপর শান্তি বর্ষণ করুন। আপনি যে পথে চললে রাযি-খুশি থাকেন আমাদের কর্ণধারদেরকে সে পথে পরিচালিত করুন। তাদের হৃদয়ে দীনের মহব্বত সৃষ্টি করে দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُونَ*وَسَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِينَ*وَالْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

সদকায়ে ফিতর ও ঈদের নামাজ