পাঠ সংক্ষেপ

ইলম অন্বেষণ করা এতই মর্যাদাপূর্ণ যে তালেবে ইলমের জন্য আসমান ও যমীনের সকল কিছুই ইস্তেগফার করে, আল্লাহর কাছে ইলম অন্বেষণকারীর জন্য মা প্রার্থনা করে। হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : ‘তালেবে ইলমের জন্য জগতের সবকিছুই (আল্লাহ তাআলার দরবারে) মা প্রার্থনা করে। এমনকি পানির মাছও’ (আবু দাউদ, তিরমিযী)।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ رَفَعَ مِنْ شَأْنِ الْعُلَمَاءِ الْعَامِلِيْنَ، فَقَالَ فِيْ كِتَابِهِ الْمُبِيْنِ: {قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِيْنَ يَعْلَمُوْنَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُوْنَ إِنَّمَا يَتَذَكَّرُ أُوْلُو الْأَلْبَابِ. } (سُوْرَةُ الزُّمَرِ:9)

وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ، لَا شَرِيْكَ لَهُ شَهَادَةَ الْحَقِّ وَالْيَقِيْنِ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْد

মুহতারাম হাযেরীন! আল্লাহকে ভয় করুন। তাকওয়া অবলম্বন করুন। উপকারী ইলম শিক্ষা করুন, যা আল্লাহ তাআলার রেযামন্দী অর্জনের পথ দেখাবে।

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বন্ধুগণ! ইসলামে জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। পড়া ও লেখা উভয় মাধ্যমই জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে অতীব জরুরী। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন :

{اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ. خَلَقَ الْإِنْسَانَ مِنْ عَلَقٍ. اقْرَأْ وَرَبُّكَ الْأَكْرَمُ. الَّذِي عَلَّمَ بِالْقَلَمِ. عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَا لَمْ يَعْلَمْ}

‘পড়ো তোমার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহামহিম, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষকে তা শিক্ষা দিয়েছেন যা সে জানত না’ (সূরা আলাক: ১-৫)

ইমাম বুখারী রহ. বলেন, কোনো বিষয়ে কিছু বলা এবং আমল করার পূর্বে সে বিষয়ে জ্ঞানার্জন করা প্রয়োজন। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন :

{فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ}

‘আর জনে নাও, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই’ (সূরা মুহাম্মাদ:১৯)।

এখানে ‘জেনে নাও’ বাক্য দ্বারা আল্লাহ তাআলা ‘ইলম শিক্ষা বা জ্ঞানার্জনের’ কথা দিয়ে শুরু করেছেন।

আর আলেমগণ হলেন নবীদের উত্তরাধিকারী। আর নবী-রাসূলগণের রেখে যাওয়া সম্পদ হলো ইলমের সম্পদ। তাঁরা কোনো দীনার-দিরহাম রেখে যান নি। অতএব যারা ইলম অর্জন করল, তারাই নবী-রাসূলগণের রেখে যাওয়া সম্পদের উত্তারাধিকারী হলো।

ইলম অর্জনের পথ জান্নাতের পথ। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন

(مَنْ سَلَكَ طَرْيقا يَلْتَمِسُ فِيْهِ عِلْما، سَهَّلَ الْلَّهُ لَهُ بِهِ طَرِيْقا إِلَىَ الْجَنَّةِ،)

‘যে ব্যক্তি ইলম অন্বেষণের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেন’ (মুসলিম )।

ইলম ও জ্ঞানই মানুষকে আল্লাহ-ভীরু করে তোলে। ইরশাদ হয়েছে :

{إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ}

‘আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল আল্লাহকে ভয় করে ’(সূরা আল ফাতির:২৮)।

আল কুরআনে আল্লাহ তাআলা যেসব উদাহরণ পেশ করেছেন, দৃষ্টান্ত দিয়েছেন তা অনুধাবনের জন্যও জ্ঞানী হওয়া প্রয়োজন। ইরশাদ হয়েছে :

{وَتِلْكَ الْأَمْثَالُ نَضْرِبُهَا لِلنَّاسِ وَمَا يَعْقِلُهَا إِلَّا الْعَالِمُونَ}

‘আর এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য পেশ করি আর জ্ঞানী লোকেরা ছাড়া কেউ তা বুঝে না’ (সূরা আল আনকাবূত:৪৩)।

যে জানে এবং যে জানেনা এ দু’ব্যক্তি সমান হতে পারে না। আল কুরআনে এ কথা স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ইরশাদ হয়েছে :

{قل هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ}

‘বল, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে ?’ (সূরা আয-যুমার:৯)

যে ব্যক্তি দীনের জ্ঞান অর্জন করার সুযোগ পেল, বুঝতে হবে যে, আল্লাহ তাআলা তার কল্যাণ চেয়েছেন। হাদীসে এসেছে :

(مِنْ يُرِدُ اللهُ بِهِ خَيْراً يُفَقِّهْهُ فِي الدِّيْنِ)

‘আল্লাহ তাআলা যার কল্যাণ চান তাকে দীনের সহীহ বুঝ দান করেন’ ( বুখারী ও মুসলিম )।

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বন্ধুগণ! ইলম অর্জন ও চর্চার প্রতি আমাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে। চর্চা ছড়া আপন ইচ্ছায় ইলম অর্জিত হয় না। আবুদ দারদা রাযি. বলেন :

(إِنَّمَا الْعِلْمُ بِالتَّعَلُّمِ)

‘ইলম তো শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমেই অর্জিত হয়’ (তাবাকাতুশ শাফিইয়াহ আল কুবরা, হাসান )।

যারা ইলম অর্জন করে আল্লাহ তাআলা তাদের মর্যাদা সমুন্নত করে দেন। ইরশাদ হয়েছে :

{يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ}

‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদা সমুন্নত করবেন। আর তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত’ (সূরা আল মুজাদালাহ:১১)

মুহতারাম হাযেরীন! জ্ঞান এমন একটি বিষয়, যে ব্যাপারে পরস্পরে ঈর্ষা করা জায়েয। ইবনে মাসঊদ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

(لَا حَسَدَ إِلَّا فِيْ اثْنَتَيْنِ: رَجُلٌ آتَاهُ اللهُ مَالاً فَسَلَّطَهُ عَلَى هَلَكَتِهِ فِي الْحَقِّ، وَرَجُلٌ آتَاهُ اللهُ حِكْمَةً فَهُوَ يَقْضِيْ بِهَا وَيُعَلِّمُهَا)

‘দুই ব্যক্তির ওপর ঈর্ষা করা যেতে পারে: একজন হলো, যাকে আল্লাহ তাআলা মাল দিয়েছেন এবং তাকে সত্যের পথে খরচ করার তাওফীকও দিয়েছেন। আর অপরজন হলো, যাকে আল্লাহ হেকমত দিয়েছেন অতঃপর সে ঐ হেকমত দ্বারা ফয়সালা করে এবং মানুষকে তা শিক্ষা দেয়’ (বুখারী)।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন :

(مَثَلُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ مِنَ الْهُدَى وَالْعِلْمِ، كَمَثَلِ الْغَيْثِ الْكَثِيرِ أَصَابَ أَرْضًا فَكَانَ مِنْهَا نَقِيَّةٌ قَبِلَتِ الْمَاءَ، فَأَنْبَتَتِ الْكَلَأَ وَالْعُشْبَ الْكَثِيرَ، وَكَانَتْ مِنْهَا أَجَادِبُ أَمْسَكَتِ الْمَاءَ، فَنَفَعَ اللَّهُ بِهَا النَّاسَ فَشَرِبُوا وَسَقَوْا وَزَرَعُوا، وَأَصَابَتْ مِنْهَا طَائِفَةً أُخْرَى إِنَّمَا هِيَ قِيعَانٌ لَا تُمْسِكُ مَاءً وَلَا تُنْبِتُ كَلَأً، فَذَلِكَ مَثَلُ مَنْ فَقُهَ فِي دِينِ اللَّهِ وَنَفَعَهُ مَا بَعَثَنِي اللَّهُ بِهِ فَعَلِمَ وَعَلَّمَ، وَمَثَلُ مَنْ لَمْ يَرْفَعْ بِذَلِكَ رَأْسًا وَلَمْ يَقْبَلْ هُدَى اللَّهِ)

‘আল্লাহ তাআলা আমাকে যে হিদায়েত ও ইলম দিয়ে প্রেরণ করেছেন তার দৃষ্টান্ত হলো ঐ প্রচুর বৃষ্টির ন্যায় যা কোনো যমীনে বর্ষিত হলো। অতঃপর যমীনের যে অংশ উত্তম ও উর্বর ছিল তা বৃষ্টির পানিকে গ্রহণ করল। এতে সেখানে বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ ও প্রচুর তৃণলতা উৎপন্ন হলো। আর যমীনের যে অংশ অনুর্বর ছিল তা বৃষ্টির পানিকে আটকে রাখল। অতঃপর তার দ্বারা আল্লাহ তাআলা মানুষের উপকার করলেন। তারা সেই পানি পান করল, করাল এবং তা দিয়ে চাষাবাদ করল। পান্তরে যমীনের যে অংশ শক্ত ছিল তা বৃষ্টির পানি আটকে রাখল না, সেখানে কোনো বৃ-লতা উৎপন্ন হলো না। সুতরাং এটা হলো ঐ ব্যক্তির উদাহরণ, যে দীনী বিষয়ে সূক্ষ্ম জ্ঞান অর্জন করল। আমার আনিত (হিদায়েত ও ইলম) গ্রহণ করে উপকৃত হলো অতঃপর সে নিজেও তা শিখল এবং অন্যদেরকেও শেখাল। আর ঐ ব্যক্তির উদাহরণ, যে আল্লাহর হিদায়াতের দিকে চোখ তুলে তাকাল না এবং সে তা কবুলও করল না’ (বুখারী)।

ইলম অন্বেষণ করা এতই মর্যাদাপূর্ণ যে তালেবে ইলমের জন্য আসমান ও যমীনের সকল কিছুই ইস্তেগফার করে, আল্লাহর কাছে ইলম অন্বেষণকারীর জন্য মা প্রার্থনা করে। হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

(وَإِنَّ طَالِبَ الْعِلْمِ يَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ حَتَّى الْحِيْتَانُ فِي الْمَاءِ)

‘তালেবে ইলমের জন্য জগতের সবকিছুই (আল্লাহ তাআলার দরবারে) মা প্রার্থনা করে। এমনকি পানির মাছও’ (আবু দাউদ, তিরমিযী)।

ইলমের ফযীলত আমলের ফযীলত থেকেও অধিক। মুতাররিফ ইবনে শিখ্খীর বলেন :

(فَضْلُ الْعِلْمِ خَيْرٌ مِنْ فَضْلِ الْعَمَلِ، وَخَيْرُ دِيْنِكُمْ الْوَرَعُ)

‘ইলমের ফযীলত আমলের ফযীলতের চেয়ে বেশি। আর তোমাদের সর্বোত্তম দীন হলো তাকওয়া পরহেযগারী’ (তাবারানী)।

প্রিয় মুসল্লিয়ান! ইলম অর্জন করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ বিষয়। তবে এক্ষেত্রে ও আমাদের ইখলাস ও ঐকান্তিকতার পরিচয় দিতে হবে। নিয়ত পরিশুদ্ধ করতে হবে। গুরুত্বের বিবেচনায় যা আগে শেখা প্রয়োজন তা আগে শিখতে হবে। এরপর ধীরে-ধীরে এগুতে হবে। মনে রাখবেন, ইখলাসশূন্য কোনো নেক আমলই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। ইরশাদ হয়েছে :

{وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ}

‘আর তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তারা যেন একনিষ্ঠ হয়ে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করে’ (সূরা আল-বায়্যিনাহ:৫)

ইলম অর্জনে ইখলাসের প্রয়োজনীয়তার কথা একটি হদীসে এভাবে এসেছে :

(مَنْ تَعَلَّمَ عِلْماً مِمَّا يَبْتَغِيْ بِهِ وَجْهَ اللهِ - عَزَّ وَجَلَّ لا يَتَعَلَّمُهُ إِلَّا لِيُصِيْبَ بِهِ عَرَضاً مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ)

‘যে ব্যক্তি এমন ইলম অর্জন করল যা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই অর্জন করা হয় অথচ সে তাকে দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যেই অর্জন করল, কিয়ামতের দিন সে বেহেশতের ঘ্রাণও পাবে না’। (আবু দাউদ, ইমাম নববী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।)

ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে প্রথমে নিয়ত পরিশুদ্ধ করা জরুরী । ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.বলেন:

الْعِلْمِ لَا يَعْدِلُهُ شَيْءٌ لِّمَنْ صَحَّتْ نِيَّتُهُ. قَالُوْا: كَيْفَ ذَلِكَ ؟ قَالَ: يَنْوِيْ رَفْعَ الْجَهْلِ عَنْ نَّفْسِهِ وَعَنْ غَيْرِهِ

‘যে ব্যক্তি নিয়ত বিশুদ্ধ করে ইলম অর্জন করবে (ছাওয়াবের দিক দিয়ে) অন্যকিছু তার বরাবর হতে পারবে না। লোকজন জিজ্ঞেস করল, এটা কিভাবে হতে পারে? উত্তরে তিনি বললেন, ‘কোনো ব্যক্তি তার নিজের ও অন্যের অজ্ঞতা দূর করার নিয়ত করবে’।

ইলম অর্জন করার একটি গুরুত্ব এখান থেকেও বুঝা যায় যে, ইলম হলো ঈমানের পথপ্রদর্শক। এর প্রমাণ আল্লাহ তাআলা এক আয়াতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-র জ্ঞান আত্মস্থ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে :

{فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ}

‘আর জেনে নাও, আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো মাবুদ নেই’ (সূরা মুহাম্মাদ:১৯)।

ইলম শুধু ঈমানেরই পথনির্দেশক নয়, বরং সকল নেক আমল ও আচার আচরণের পথনির্দেশক। আমল শুদ্ধ হওয়ার পথনির্দেশক।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! ইলম অর্জনকারীর কিছু দায়দায়িত্ব রয়েছে। তন্মধ্যে প্রধান হলো, ইলম অর্জনে আমানতদারী রা করা। অর্জিত ইলম মানুষের মধ্যে প্রচার করা। ইলম অনুযায়ী মানুষকে নসীহত করা এবং মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের পথে আহ্বান করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

(مَنْ دَعَا إِلَى الْهُدَى كَانَ لَهُ مِنْ الْأَجْرِ مِثْلُ أُجُوْرِ مَنْ تَبِعَهُ، إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ لَا يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ أُجُوْرِهِمْ شَيْءٌ)

‘কোনো লোক যদি কোনো ভালো কাজের দিকে আহবান করে তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত যত লোক তার অনুসরণ করবে সে সকলের সমপরিমাণ ছাওয়াব লাভ করবে। কিন্তু তার আহ্বনে সাড়া দিয়ে যারা ঐ ভালো কাজটি সম্পাদন করল তাদের ছাওয়াব থেকে সামান্য পরিমাণ ছাওয়াবও হ্রাস করা হবে না’ (মুসলিম) ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যথার্থরূপে ইলম অর্জন করে তদনুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

أعوذ بالله من الشيطان الرجيم : {يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ } (سورة المجادلة:11)

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ، أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ .

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ عَلَّمَ بِالْقَلَمِ، عَلَّمَ الْإِنْسَانَ مَالَمْ يَعْلَمْ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمْداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، أَمَّا بَعْدُ:

প্রিয় ভাইয়েরা! ইসলাম দীনী ইলম ও অভিজ্ঞতালব্ধ পার্থিব ইলম উভয় প্রকার ইলমের প্রতিই গুরুত্বারোপ করেছে। কেননা আমাদেরকে এ পৃথিবীতে থেকেই ঈমান ও আমলের পরীক্ষা দিতে হবে। তাই প্রয়োজনীয় দুনিয়াবী ইলমও আমাদেরকে অর্জন করতে হবে। ইসলাম দুনিয়াবী জ্ঞানার্জনকে নাকচ করে দেয়নি, বরং স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশেষ করে প্রায়োগিক ইলম বা জ্ঞান যা না হলে যথার্থরূপে পৃথিবীকে কর্ষণ করা সম্ভব হয় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরতের পর দেখতে পেলেন যে, সাহাবায়ে কিরাম খেজুর উৎপাদনে কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়ার আশ্রয় নেন। তিনি প্রথমে তা নিষেধ করলেন। সাহাবায়ে কিরাম কৃত্রিম প্রজনন প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিলেন। ফলে দেখা গেল যে খেজুরের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে গিয়েছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুনরায় অনুমতি দিয়ে বললেন :

(أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِشُؤُونِ دُنْيَاكُمْ)

‘তোমাদের পার্থিব বিষয়ে তোমরাই বেশি অবগত’ (মুসলিম)।

কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে খেজুরের উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়া অভিজ্ঞতালব্ধ একটি দুনিয়াবী ইলম। এ জ্ঞানকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীকৃতি দিয়েছেন। অন্য কথায় বলতে গেলে যা মানুষের জন্য কল্যাণকর, এমন সকল জ্ঞানই অর্জন করা ইসলামে স্বীকৃত। সেই থেকে আমাদের পূর্ব পুরুষগণ প্রায়োগিক জ্ঞান-বিজ্ঞান শুধু যে অর্জন করেছেন তাই নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই তারা ছিলেন সফল উদ্ভাবক। আধুনিক বিজ্ঞান, বলা যায়- তাদেরই নির্মিত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ইবনুল হাইসাম, ইবনে রুশদ আল হাফীদ ও অন্যান্য মুসলিম মনীষী এ ক্ষেত্রের অত্যুজ্জ্বল উদাহরণ।

প্রিয় ভাইয়েরা! আধুনিক শিক্ষা ইসলামে নিষিদ্ধ নয়। তবে তা হতে হবে একজন সুনাগরিক তৈরির হাতিয়ার। আল্লাহর প্রতি বলিষ্ঠ বিশ্বাসী তৈরির হাতিয়ার। যথার্থরূপে পৃথিবীকে কর্ষণ করতে পারে এমন মানুষ তৈরির হাতিয়ার। তবে দুঃখের বিষয় হলো, মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ এলাকায় শিক্ষার নামে এমন কিছু শেখানো হয়, যা কোনো অর্থেই উপকারী জ্ঞানের আওতায় পড়ে না যা সত্যিকার অর্থে একজন জ্ঞানী তৈরি করতে ব্যর্থ।

প্রিয় মুসল্লিয়ানে কিরাম! শিক্ষার ব্যাপারে আমাদেরকে আরো ঐকান্তিক হতে হবে। অন্যথায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধ্বংস হতে থাকবে। শিক্ষানীতির নামে সার্টিফিকেটধারী অজ্ঞ লোক তৈরি হওয়ার সিলসিলা চালু হয়ে যাবে।

প্রিয় ভাইয়েরা! আমাদের গোটা সমাজকে শিতি করে তুলতে হবে। নিররতা দূরীকরণে সরকার ও সাধারণ মানুষ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষা র প্রতি মানুষকে আগ্রহী করার জন্য আমাদেরকে নানামুখী কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। যারা শিতি তাদের জ্ঞানের পরিধি বর্ধন, উপকারী জ্ঞান চর্চা অব্যাহত রাখর জন্য সুযোগ সৃষ্টি ইত্যাদির প্রতি আমাদেরকে গুরুত্ব দিতে হবে।

হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

(إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ، إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ)

‘মানুষ যখন মারা যায় তখন তার আমলের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তবে তিনটি বিষয় ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়া অথবা এমন ইলম যা উপকার পৌঁছায় অথবা নেককার সন্তান যে তার জন্য দুআ করে’ (মুসলিম)।

প্রিয় মুসল্লিয়ান! ইলম ও জ্ঞানে পরিপক্ক হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তবে সাথে সাথে আমাদেরকে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে ইলম অনুযায়ী আমরা আমল করছি কিনা। খেয়াল রাখতে হবে যে ইলম শুধু অর্জন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না, বরং অর্জিত ইলমের প্রয়োগ ঘটানো অত্যন্ত জরুরী। কেননা ইলমের চাহিদা হলো আমল করা।

الْعِلْمِ يَهْتِفُ بِالْعَمَلِ ، فَإِنْ أَجَابَهُ وَإِلَا ارْتَحَلَ

‘ইলম আমলকে আহবান করে। যখন তার আহবানে সাড়া দেয়া হয় তখন তা থাকে, অন্যথায় তা চলে যায়’।

তাই আসুন, আমরা ইলম শিখি। জ্ঞানার্জন করি এবং তদনুযায়ী আমলও করি। তবেই আমাদের অজ্ঞতা দূর হবে এবং আমাদের ইলম অবশিষ্ট থাকবে।

اَللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنْ آلِ نَبِيِّكَ الطَّيِّبِيْنَ الطَّاهِرِيْنَ وَعَنْ أَزْوَاجِهِ أُمُّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَعَنِ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ.

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে দীনী ইলম শিক্ষা করার তাওফীক দান করুন। আপনার হুকুম-আহকাম সম্পর্কে জ্ঞান লাভের তাওফীক দান করুন। অজ্ঞতা-মূর্খতা থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন। উপকারী দুনিয়াবী ইলম শেখারও তাওফীক দান করুন। সকল প্রকার অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে আমাদেরকে রা করুন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে ইলমের হক আদায়ের তাওফীক দান করুন। ইলম অনুযায়ী আমল করার তাওফীক দিন।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে সকল প্রকার বালা-মুসীবত ও বিপদাপদ থেকে হিফাযত করুন। আমাদের অভাব দূর করে দিন। আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষিকর্মে বরকত দিন। আমাদেরকে হালাল কামাই করার তাওফীক দিন।

হে আমাদের রব! আপনি আমাদের যাবতীয় পেরেশানী দূর করে দিন। আমাদের কামাই-রুযিতে বরকত দিন। আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে দীনদার, মুত্তাকী ও পরহেযগার বানিয়ে দিন।

হে পরমপ্রিয় মাওলা! দয়া করে আপনি গোটা পৃথিবীতে সুখ-শান্তির ফয়সালা করুন। প্রতিটি দেশে আপনার পছন্দনীয় শাসক নিযুক্ত করুন এবং আমাদেরকে ইসলাম ও মুসলমানের শত্র“দের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাওফীক দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله : ( إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.