পাঠ সংক্ষেপ

দুর্ভিক্ষ আল্লাহ থেকে বান্দার দূরে অবস্থানের আলামত। আল্লাহর নিষিদ্ধ সীমানা অতিক্রম করার আলামত। আর আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার অর্থই হলো অকল্যাণ ও দুর্যোগের আগমন। বরকতের বিলুপ্তি। তবে আল্লাহ তাআলা রাহমান রাহীম। তাইতো তিনি ইস্তিসকা তথা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনার উদ্দেশ্যে নামায বিধিবদ্ধ করেছেন, যাতে মানুষ তাঁর কাছে ফিরে যায়। আহাজারি-কান্নাকাটি করে। সম্পর্ক ঠিক করে নেয়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বৃষ্টির ব্যবস্থা করেন

الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ. مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ، اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ لَهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ، وَلَهُ الْحَمْدُ فِيْ الْآخِرَةِ وَهُوَ الْحَكِيْمُ الْخَبِيْرُ، الْحَمْدُ لِلَّهِ مُغِيْثِ الْمُسْتَغِيْثِيْنَ، وَمُجِيْبِ دَعْوَةِ الْمُضْطَرِّيْنَ، وَكَاشِفِ كَرْبِ الْمَكْرُوْبِيْنَ، وَمُسْبِغِ النِّعَمِ عَلَى الْعِبَادِ أَجْمَعِيْنَ، وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوُلُهُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَمَنْ سَارَ عَلَى نَهْجِهِ وَاقْتَفَى، وَسَلَّمَ تَسْلِيْماً كَثِيْراً إِلَى يَوْمِ الدِّيِنِ، أَمَّا بَعْدُ:

সম্মানিত উপস্থিতি! প্রথমে আমি নিজকে ও আপনাদেরকে তাকওয়া অবলম্বনের জন্য উপদেশ দিচ্ছি।

অতঃপর জেনে নিন, পানি শুধু মানবজীবনের জন্যই অপরিহার্য নয়, সকল প্রাণীর জন্যই অপরিহার্য একটি নিয়ামত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

{ وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ }

‘আমি সকল প্রাণীর উদ্ভব পানি থেকে ঘটিয়েছি’ (সূরা আল আম্বিয়া: ৩০)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের এ বাণীটিকে মনে হয় মানুষ তার ভাষায় ব্যক্ত করে বলে থাকে, ‘পানির অপর নাম জীবন’।

পৃথিবীতে আমরা দেখতে পাই, নদীর পানি, পুকুরের পানি, সাগরের পানি, ভূগর্ভস্থ পানি, ঝর্নার পানি। এ সব পানির মধ্যে সবচেয়ে বিশুদ্ধ পানি হল বৃষ্টির পানি। আধুনিক বিজ্ঞান এ সত্যটি আবিষ্কারের বহু পূর্বে আল কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন :

{ وَأَنْزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا . لِنُحْيِيَ بِهِ بَلْدَةً مَيْتًا وَنُسْقِيَهُ مِمَّا خَلَقْنَا أَنْعَامًا وَأَنَاسِيَّ كَثِيرًا. }

‘আর আমি আকাশের দিকে থেকে পবিত্র পানি বর্ষণ করেছি। যাতে তা দ্বারা মৃত ভূখণ্ডকে জীবিত করি এবং আমি যে সকল জীবজন্তু ও মানুষ সৃষ্টি করেছি, তার মধ্য থেকে বহু জনকে তা পান করাই’ (সূরা আল ফুরকান: ৪৮-৪৯)।

সকল পানির উৎস হল এ বৃষ্টি। পানি চক্রের প্রথম ধাপ হল এ বৃষ্টি। বৃষ্টির কারণে জমি জীবিত হয়। খাদ্য-শস্য উৎপন্ন করার উপযোগী হয়। গাছ-পালা, তরু-লতা জন্ম লাভ করে এবং বেঁচে থাকে।

কিন্তু কখনো কখনো এ বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। মানুষের জীবনযাপন তখন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। অসহায় মানুষ তখন কী করবে? কী করতে পারে? বৃষ্টি বর্ষণ করার ক্ষমতা যেমন কারো নেই তেমনি তা বন্ধ করার শক্তিও কারো নেই।

এ অবস্থায় মানুষের করণীয় কী? যিনি বৃষ্টির মালিক তাঁর কাছেই তাকে ফিরে যেতে হয়। তাঁর কাছেই প্রার্থনা করতে হয়। এ প্রার্থনা ও দু‘আ -মুনাজাতের পদ্ধতিকে ইসলামের পরিভাষায় আমরা বলি আল- ইসতিসকা।

উপস্থিত ঈমানদার ভাইয়েরা! মানুষ যখন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের আদেশ-নিষেধ মান্য করে জীবন পরিচালনা করে, তখন মানুষের জীবনে সুখ-শান্তি বিরাজমান থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

{ وَلَوْ أَنَّهُمْ أَقَامُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنْجِيلَ وَمَا أُنْزِلَ إِلَيْهِمْ مِنْ رَبِّهِمْ لَأَكَلُوا مِنْ فَوْقِهِمْ وَمِنْ تَحْتِ أَرْجُلِهِمْ مِنْهُمْ أُمَّةٌ مُقْتَصِدَةٌ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ سَاءَ مَا يَعْمَلُونَ }

‘ আর যদি তারা তাওরাত, ইনজীল ও তাদের নিকট তাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা কায়েম করত, তবে অবশ্যই তারা আহার করত তাদের ওপর থেকে এবং তাদের পদতল থেকে। তাদের মধ্য থেকে সঠিক পথের অনুসারী একটি দল রয়েছে এবং তাদের অনেকেই যা করছে, তা কতইনা মন্দ’! (সূরা আল মায়েদা: ৬৬)।

মানুষ যদি আল্লাহ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে, তাওবা-স্তেগফার করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য পরিমিত বৃষ্টি বর্ষণ করেন। তাদের শক্তিশালী করেন।

আল্লাহ তা‘আলা নবী হূদ আ.এর একটি আহ্বান পবিত্র কুরআনে এভাবে ব্যক্ত করেন :

{ وَيَا قَوْمِ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ ثُمَّ تُوبُوا إِلَيْهِ يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا وَيَزِدْكُمْ قُوَّةً إِلَى قُوَّتِكُمْ وَلَا تَتَوَلَّوْا مُجْرِمِينَ }

‘ হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও অতঃপর তার কাছে তাওবা কর, তাহলে তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি পাঠাবেন এবং তোমাদের শক্তির সাথে আরো শক্তি বৃদ্ধি করবেন। আর তোমরা অপরাধী হয়ে বিমুখ হয়ো না’ (সূরা হূদ: ৫২)।

সকল প্রকার পাপাচার ও অন্যায় কাজ থেকে তাওবা করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে রহমতের বৃষ্টি ও বরকত নাযিল হয়ে থাকে।

কোনো দেশের অধিবাসীরা যদি ঈমানদার, মুত্তাকী ও সৎ হয়ে যায়। যুলম, অত্যাচার, অনাচার, পাপাচার, দুর্নীতি থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলার বিধান হলো, তাদেরকে প্রাচুর্যের মধ্যে রাখা। আর যদি তারা এর বিপরীত পন্থা অবলম্বন করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলার বিধান হলো, বিভিন্ন আজাব-গজব ও সঙ্কট দিয়ে তাদের পাকড়াও করা। ইরশাদ হয়েছে :

{ وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَى آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِمْ بَرَكَاتٍ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَكِنْ كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُمْ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ }

‘ আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও যমীন থেকে বরকতসমূহ তাদের ওপর খুলে দিতাম কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম’ (সূরা আল আরাফ: ৯৬)।

এমনিভাবে গুনাহ, পাপাচার মানুষের সমাজে ও ব্যক্তিজীবনে অনেক দুর্গতি বয়ে আনে।

ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন: পাপাচার মানুষকে অপমানিত করে, তার সম্মান মর্যাদা কমিয়ে দেয়। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি নষ্ট করে দেয়। পাপের কারণে আত্ম-সম্মানবোধ ও লজ্জা লোপ পায়। অন্তর দুর্বল হয়ে যায়। আল্লাহকে ভুলে যায়। আল্লাহ তা‘আলার নিয়ামত চলে যায়। হৃদয় ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়ে। দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়। হীনমন্যতা পেয়ে বসে। বরকত চলে যায়। নিজকে ছোট মনে হয়। উপরন্তু পাপী ব্যক্তি বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে পতিত হয়।

আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন :

{ ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ لِيُذِيقَهُمْ بَعْضَ الَّذِي عَمِلُوا لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ }

‘মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় প্রকাশ পায়। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদেরকে আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে’ (সূরা আর রূম: ৪১)।

মানুষের কৃত পাপাচার ও অন্যায়ের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনাবৃষ্টি, খরা, ঝড়-তুফান, সাইক্লোন, ভূমিকম্প, দাবানল ইত্যাদি শাস্তি হিসাবে মানুষের ওপর আপতিত হয়।

উদ্দেশ্য হল, এর মাধ্যমে মানুষ যেন আল্লাহ তা‘আলার বিধি-বিধানের কাছে ফিরে আসে। তারই কাছে আত্মসমর্পন করে। তারই সামনে বিনয় ও নম্রতার সাথে নত হয়। নিজদের অন্যায় ও কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাওবা-ইস্তেগফার করে।

আল্লাহর নবী নূহ আ. তাঁর জাতিকে কী বলেছিলেন, দেখুন :

{ فَقُلْتُ اسْتَغْفِرُوا رَبَّكُمْ إِنَّهُ كَانَ غَفَّارًا . يُرْسِلِ السَّمَاءَ عَلَيْكُمْ مِدْرَارًا . وَيُمْدِدْكُمْ بِأَمْوَالٍ وَبَنِينَ وَيَجْعَلْ لَكُمْ جَنَّاتٍ وَيَجْعَلْ لَكُمْ أَنْهَارًا . مَا لَكُمْ لَا تَرْجُونَ لِلَّهِ وَقَارًا. }

‘ আর বলেছি, ‘তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল’। ‘তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ‘আর তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগ-বাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা’। ‘তোমাদের কী হলো, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া করছ না’? (সূরা নূহ: ১০-১৩)।

এভাবেই মানুষ যখন শিরকসহ সকল পাপাচার থেকে ফিরে এসে আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাওবা ও ইস্তেগফার করে, তখন তিনি মুষলধারে বরকতময় বৃষ্টি বর্ষণ করেন। আর এর মাধ্যমে তিনি সর্বদিক দিয়ে সচ্ছলতা ও প্রাচুর্য দান করেন।

সম্মানিত উপস্থিতি! বৃষ্টি শুধুমাত্র আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় ও তার হুকুমেই হয়ে থাকে। ঈমানদাররা তো এটা অবশ্যই বিশ্বাস করে এমনকি ইসলামের আগমন কালে ইসলামের শত্র“ মুশরিকরাও পর্যন্ত বিশ্বাস করত যে, বৃষ্টি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই দান।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

{ وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ مَنْ نَزَّلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَحْيَا بِهِ الْأَرْضَ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهَا لَيَقُولُنَّ اللَّهُ قُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ }

‘আর তুমি যদি তাদেরকে প্রশ্ন কর, ‘কে আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা যমীনকে তার মৃত্যুর পর সঞ্জীবিত করেন’? তবে তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ’। বল, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহর’। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বুঝে না’ (সূরা আর রূম: ৬৩)।

হ্যাঁ, তখনকার মুশরিকদের কাছে প্রশ্ন করলে তারা এ রকম উত্তরই দিত বলে আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জানিয়েছেন।

কিন্তু আফসোসের বিষয়! আজকাল আমাদের অনেক মুসলমানের হৃদয় থেকেও এ বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছে। তারা বৃষ্টির জন্য বিবিধ প্রাকৃতিক কারণকে দায়ী করেন। এমনিভাবে অনাবৃষ্টির জন্য বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণ বর্ণনা করেন। অনেকে এমন আছেন যারা বৃষ্টি দেখলে তাদের পূজনীয় কবিদের গান ধরেন। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলার শুকরিয়া আদায় না করে কবি সাহিত্যিকদের গুণগান করে বেড়ান, তাদের কালাম জপেন। বৃষ্টি ও বর্ষা সম্পর্কিত তাদের বাণীগুলো আওড়ান। আর এভাইে ঈমান-আকীদার ক্ষেত্রে অধঃপতনের দিক থেকে মুসলমানরা আজ আগেকার যুগের কাফির মুশরিকদের আমরা ছাড়িয়ে যেতে বছেসে।

সহীহ বুখারীতে খালেদ আল জুহানী রাযি. থেকে বর্ণিত, হুদাইবিয়া অভিযানে একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফজরের নামায পড়ালেন। রাতের বেলায় বৃষ্টি হয়েছিল। নামায শেষে তিনি সকলের দিকে মুখ করে প্রশ্ন করলেন :

(هَلْ تَدْرُوْنَ مَاذَا قَالَ رَبُّكُمْ؟ قَالُوْا: اللهُ وَرَسُوْلُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: أَصْبَحَ مِنْ عِبَادِيَ مُؤْمِنٌ بِي وَكَافِرٌ، فَأَمَّا مَنْ قَالَ مُطِرْنَا بِفَضْلِ اللهِ وَرَحْمَتِهِ فَذَلِكَ مُؤْمِنٌ بِيْ كَافِرٌ بِالْكَوْكَبِ، وَأَمَّا مَنْ قَالَ بِنَوْءِ كَذَا وَكَذَا فَذَلِكَ كَافِرٌ بِيْ مُؤْمِنٌ بِالْكَوْكَبِ. )

তোমরা কি জানো, তোমাদের রব কী বলেছেন? লোকেরা বলল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন। তিনি বললেন, আল্লাহ বলেছেন: আমার কিছু বান্দা আমার প্রতি ঈমানদার হয়ে ভোর করেছে আবার কিছু বান্দা আমার সাথে কুফরী করে ভোরে উপনীত হয়েছে। যে বলেছে, আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও অনুগ্রহে বৃষ্টি হয়েছে সে আমার প্রতি ঈমানদার হয়েছে, আর তারকা-নক্ষত্রকে অস্বীকার করেছে। আর যে বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের প্রভাবে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার সাথে কুফরী করেছে আর তারকা-নক্ষত্রের প্রতি ঈমান এনেছে’ (বুখারী)।

কাজেই বৃষ্টির মালিক ও নিয়ন্ত্রক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তার নির্দেশেই বৃষ্টি হয়, আর তার নির্দেশেই খরা আসে। সকল গুনাহ থেকে তাওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আমাদের ফিরে যেতে হবে। একমাত্র তাঁরই কাছে কান্নাকাটি করতে হবে। ইস্তেগফার ও ক্ষমাপ্রার্থনা করতে হবে। একমাত্র আল্লাহর কাছেই বৃষ্টির জন্য আহাজারী করতে হবে। দরখাস্ত পেশ করতে হবে। হৃদয়-মন নরম করে একমাত্র তাঁরই সামনে দাঁড়াতে হবে অশ্র“সিক্ত নয়নে।

সুপ্রিয় মুসল্লিয়ান! আমরা যখন খরায় পুড়ি, বৃষ্টির অভাবে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হই, তখন আমাদের কর্তব্য হল বিনয়, আহাজারী. তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে বৃষ্টির জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে প্রার্থনা করা।

সহীহ বুখারীতে এসেছে : আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘর থেকে বের হয়ে নামাযের ময়দানে গেলেন। বৃষ্টি প্রার্থনা করলেন। কেবলামুখী হলেন। চাদর উল্টিয়ে পরিধান করলেন আর দু’রাক‘আত নামায আদায় করলেন (বুখারী)।

হাদীসে আরো এসেছে: আব্বাদ ইবনে তামীম রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর চাচা বলেন:

‘রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃষ্টি প্রার্থনার জন্য লোকদের নিয়ে বের হলেন। তিনি তাদের সামনে দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দু‘আ করলেন। এরপর কেবলামুখী হলেন। গায়ের চাদর উল্টিয়ে দিলেন। অতঃপর বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হলো’ (বুখারী)

সহীহ বুখারীতে আরো এসেছে, আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসতিসকাতে যেভাবে হাত উঠিয়ে দু‘আ করতেন অন্যকোন সময় সেভাবে উঠাতেন না। আর তিনি এমনভাবে হাত উঠাতেন যে, তাঁর বগলের সুভ্রতা প্রকাশ পেত (বুখারী)।

সহীহ বুখারীতে আরো এসেছে,আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ আল আনসারী, তার সাথে বারা ইবনে আযেব ও যায়েদ বিন আরকাম রাযি. বের হলেন। বৃষ্টি প্রার্থনা করলেন। তিনি লোকদের সম্মুখে দাঁড়ালেন কোনো মিম্বর ছাড়াই পায়ের ওপর দাঁড়ালেন। ইস্তিগফার করলেন। উচ্চ কিরাআতে দু’রাকাআত নামায আদায় করলেন। সে নামাযে কোন আযান ইকামাত ছিল না।

তিরমিযী বর্ণিত একটি সহীহ হাদীসে এসেছে, আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে মানব সন্তান! তুমি আমার কাছে যা দু‘আ করবে, যা আশা করবে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। আগে তোমার অবস্থা যা-ই থাক না কেন। এতে আমার কোন পরোয়া নেই।

হে আদম সন্তান! তোমার পাপের পরিমাণ যদি আসমান বরাবর হয়, আর তুমি ক্ষমা চাও, তাহলেও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব।

হে আদম সন্তান! তুমি যদি দুনিয়া ভর্তি পাপ নিয়ে আমার কাছে উপস্থিত হও, আর আমার সাথে শিরক না করে থাক তাহলে আমি তোমার পাপের সমপরিমাণ ক্ষমা তোমাকে দান করব।

এভাইে ক্ষমা প্রার্থনা, ইস্তেগফার আর শিরক থেকে বেঁচে থাকার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার রহমত ও মাগফিরাত লাভ করা যায়।

সহীহ বুখারীতে এসেছে, ইবনে মাসঊদ রাযি. থেকে বর্ণিত, কুরাইশরা ইসলাম প্রচারে বাধা দিতে থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের বিরুদ্ধে দু‘আ করলেন। ফলে খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দিল। তারা ধ্বংস হতে লাগল। ক্ষুধার তাড়নায় মৃত জন্তু ও হাড্ডি খেতে লাগল। আবু সুফিয়ান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! তুমি আতœীয়তা-সম্পর্কের কথা বল, আর তোমার জাতি তো খরায় অনাহারে শেষ হয়ে যাচ্ছে। তুমি আল্লাহর কাছে দু‘আ করো।

এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তিলাওয়াত করলেন-

{ فَارْتَقِبْ يَوْمَ تَأْتِي السَّمَاءُ بِدُخَانٍ مُبِينٍ . يَغْشَى النَّاسَ هَذَا عَذَابٌ أَلِيمٌ . رَبَّنَا اكْشِفْ عَنَّا الْعَذَابَ إِنَّا مُؤْمِنُونَ . أَنَّى لَهُمُ الذِّكْرَى وَقَدْ جَاءَهُمْ رَسُولٌ مُبِينٌ . ثُمَّ تَوَلَّوْا عَنْهُ وَقَالُوا مُعَلَّمٌ مَجْنُونٌ . إِنَّا كَاشِفُوا الْعَذَابِ قَلِيلًا إِنَّكُمْ عَائِدُونَ . }

‘ অতএব অপেক্ষা কর সেদিনের, যেদিন স্পষ্ট ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হবে আকাশ। যা মানুষদেরকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে: এটি যন্ত্রণাদায়ক আযাব। (তখন তারা বলবে) ‘হে আমাদের রব, আমাদের থেকে আযাব দূর করুন নিশ্চয় আমরা মুমিন হব’। এখন কীভাবে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে, অথচ ইতোপূর্বে তাদের কাছে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনাকারী রাসূল এসেছিল? তারপর তারা তাঁর দিক থেকে বিমুখ হয়েছিল এবং বলেছিল ‘এ শিক্ষাপ্রাপ্ত পাগল’। নিশ্চয় আমি ক্ষণকালের জন্য আযাব দূর করব নিশ্চয় তোমরা পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে’ (সূরা আদ দুখান: ১০-১৫)।

এরপর তারা আবার কুফরীতে ফিরে গেল। এমতাবস্থায় তাদেরকে লক্ষ্য করে নাযিল হলো :

{ يَوْمَ نَبْطِشُ الْبَطْشَةَ الْكُبْرَى إِنَّا مُنْتَقِمُونَ }

‘সেদিন আমি প্রবলভাবে পাকড়াও করব নিশ্চয় আমি হব প্রতিশোধ গ্রহণকারী’ (দুখান: ১৬)।

আর আল্লাহর তা‘আলার এ পাকড়াও ও প্রতিশোধ বাস্তবায়িত হয়েছিল বদরের যুদ্ধে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের আবেদনের পর বৃষ্টির জন্য দু‘আ করলেন। অতঃপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষিত হল। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকল পাপ-অন্যায় ক্ষমা করে দিয়ে আমাদের জন্য বৃষ্টির ফয়সালা করুন।

اَللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيْمَ إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنْ آلِ نَبِيِّكَ الطَّيِّبِيْنَ الطَّاهِرِيْنَ وَعَنْ أَزْوَاجِهِ أُمُّهَاتِ الْمُؤْمِنِيْنَ وَعَنِ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ.

হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমরা তাওবা করছি, আপনি আমাদের ছগীরা-কবীরা সকল গুনাহ মাফ করে দিন। হে আল্লাহ আপনার ইবাদত চর্চায় আমাদের ত্র“টি বিচ্যুতি মাফ করে দিন। হে আল্লাহ! আপানি আমাদের জন্য বৃষ্টির ফয়সালা করে দিন। হে আল্লাহ আমরা দরিদ্র, একমাত্র আপনিই ধনী। আমরা দুর্বল-নিঃস্ব, আর আপনি মহামহিম, সকল ক্ষমতার অধিকারী, তাই আপনি আমাদের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান। হে আল্লাহ! আমরা আপনার রহমত প্রত্যাশী, আপনার করুণা প্রত্যাশী, আমাদের আপনি করুণা করুন। আমাদেরকে আপনি বৃষ্টি দিন। অনাবৃষ্টি থেকে আমাদের উদ্ধার করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

عِبَادَ الله –رَحِمَكُمُ الله- إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالإِحْسَانِ وَإِيتَاء ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاء وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ.

-------------