পাঠ সংক্ষেপ

আল্লাহ তা‘আলা সুদ খাওয়া, সুদভিত্তিক লেনদেন করা হারাম করে দিয়েছেন। যারা সুদ খায় তাদের ঠিকানা জাহান্নাম বলে ঘোষণা করেছেন। সুদখোরের বিরুদ্ধে তাঁর ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। সুদখোর, সুদদাতা, সুদী লেনদেনের সাক্ষী এবং সুদী লেনদেনের চুক্তি লেখক সবার প্রতিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লানত করেছেন। সুদ ধ্বংস করে সম্পদ মুছে ফেলে বরকত ।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِيْ أَحَلَّ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا، وَغَفَرَ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحا ثُمَّ اهْتَدَى. أَحْمَدُهُ عَلَى إِحْسَانِهِ وَأَشْكُرُهُ عَلَى تَوْفِيْقِهِ وَامْتِنَانِهِ. جَعَلَ الْحَلَالَ الْغَنِيَّةَ عَنْ الْحَرَامِ وَوَعْدَ مِنْ اتَّقَاهُ أَنْ يَجْعَلَ لَهُ مَخْرَجاً، وَيَرْزُقَهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ، وَاشْهِدُ أَنَّ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسْولُهُ صَلَّىَ اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَسَلَّمَ تَسْلِيْما كَثِيْرَا، أَمَّا بَعْدُ:

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আল্লাহ তা‘আলা সুদ খাওয়া, সুদভিত্তিক লেনদেন করা হারাম করে দিয়েছেন। যারা সুদ খায় তাদের ঠিকানা জাহান্নাম বলে ঘোষণা করেছেন। সুদখোরের বিরুদ্ধে তাঁর ও তাঁর রাসূলের পক্ষ হতে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে :

{إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآَتَوُا الزَّكَاةَ لَهُمْ أَجْرُهُمْ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ. يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ. فَإِنْ لَمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ.}

‘ নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও নেক আমল করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত প্রদান করে, তাদের জন্য রয়েছে তাদের রবের নিকট প্রতিদান। আর তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না। হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও।কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও, আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা যুলম করবে না এবং তোমাদের যুলম করা হবে না’ (সূরা আল-বাকারা : ২৭৭-২৭৯)

সুদখোর, সুদদাতা, সুদী লেনদেনের সাক্ষী এবং সুদী লেনদেনের চুক্তি লেখক সবার প্রতিই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লানত করেছেন। হাদীসে এসেছে

(لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَليْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا وَمُؤْكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ)

‘ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদখোর, সুদদাতা, সুদের চুক্তি লেখক ও সাক্ষীদ্বয়ের প্রতি লানত করেছেন’ (মুসলিম)।

যে এলাকায় সুদ ও যিনা প্রকাশ পাবে সে এলাকাবাসীর প্রতি আল্লাহর আযাব নাযিলের হুঁশিয়ারবাণীও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উচ্চারণ করেছেন। হাদীসে এসেছে :

(إِذَا ظَهَرَ الزِّنَا وَ الرِّبَا فِيْ قَرْيَةٍ فَقَدْ أَحَلُّوْا بِأَنْفُسِهِمْ عَذَابَ اللهِ)

‘যদি কোনো গ্রামে যিনা ও সুদ প্রকাশ পায়, তবে ওই গ্রামবাসী নিজদের ওপর আল্লাহর আযাব নাযিল করে নিল’ (আলবানী : সহীহুল জামে)।

সুদ সম্পদকে ধ্বংস করে দেয় ও সম্পদের বরকত মুছে ফেলে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

{يَمْحَقُ اللَّهُ الرِّبَا وَيُرْبِي الصَّدَقَاتِ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلَّ كَفَّارٍ أَثِيمٍ}

‘ আল্লাহ সুদকে মিটিয়ে দেন এবং সাদকাকে বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ কোনো অতি কুফরকারী পাপীকে ভালোবাসেন না’ (সূরা আল বাকরা : ২৭৬)

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন :

{وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِبًا لِيَرْبُوَا فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلَا يَرْبُوا عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُوْلَئِكَ هُمْ الْمُضْعِفُونَ}

‘ আর তোমরা যে সূদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদে বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলতঃ আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। আর তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে (তাই বৃদ্ধি পায়) এবং তারাই বহুগুণ সম্পদ প্রাপ্ত’ (সূরা আর-রূম : ৩৯)

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! সুদ খাওয়া বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা কঠোর হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। সুদ খাওয়াকে তিনি ঘৃণ্যতম অপরাধের মধ্যে শামিল করেছেন। কবীরা গুনাহের মধ্যে শামিল করেছেন। যে সুদ খায় দুনিয়া ও আখেরাতে তার করুণ পরিণতির কথা উল্লেখ করেছেন। সুদখোরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। সুদখোরের পার্থিব শাস্তি হলো তার সম্পদের বরকত চলে যাওয়া, সম্পদ নষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া। যদি সুদখোরের হাতে সম্পদ থেকেও যায় তবুও তা দ্বারা সে উপকৃত হতে পারে না। বরং এ সম্পদের নানা যন্ত্রণা ও বিড়ম্বনা সইতে সইতেই তার জীবন অতিবাহিত হতে থাকে। এ সম্পদের আযাব তার জীবনকে বিষিয়ে তুলে।

সুদখোর যখন হাশর-নশরের জন্য কবর থেকে উঠবে তার অবস্থা হবে খুবই ন্যাক্কারজনক। সুদখোরের এ অবস্থাকে চিত্রিত করে আল কুআনের ইরশাদ হয়েছে :

{الَّذِينَ يَأْكُلُونَ الرِّبَا لَا يَقُومُونَ إِلَّا كَمَا يَقُومُ الَّذِي يَتَخَبَّطُهُ الشَّيْطَانُ مِنَ الْمَسِّ}

‘যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়’ (সূরা আল বাকারা : ২৭৫)

অন্যান্য মানুষ যখন কবর থেকে উঠবে তারা ময়দানে হাশরের দিকে ছুটে চলবে। ইরশাদ হয়েছে :

{يَوْمَ يَخْرُجُونَ مِنَ الْأَجْدَاثِ سِرَاعًا}

‘যেদিন দ্রুতবেগে তারা কবর থেকে বের হয়ে আসবে, যেন তারা কোন লক্ষ্যের দিকে ছুটছে’ (সূরা আল মাআ‘রিজ : ৪৩)

কিন্তু সুদখোরের অবস্থা হবে ভিন্ন রকম। সে অন্যান্য মানুষের মতো ময়দানে হাশরের দিকে ছুটে যেতে পারবে না। সে মাতাল অবস্থায় মৃগীরোগাক্রান্ত ব্যক্তির ন্যায় মূর্ছা খেয়ে খেয়ে খুব কষ্টে ময়দানের হাশরের দিকে এগিয়ে যাবে।

ইসরা ও মিরাজের হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে রক্তের নদীতে সাঁতার কাটতে দেখলেন। লোকটি যখনই নদী থেকে ওঠে আসার জন্য তীরে আসছে। এক ব্যক্তি পাথর হাতে তার মুখোমুিখ হচ্ছে এবং তার মুখ লক্ষ্য করে একটি পাথর ছুড়ে মারছে। অতঃপর নদীতে সাঁতরানো লোকটি পূর্বের জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে উত্তরে বলা হলো যে লোকটি সুদখোর। আনাস রাযি. থেকে এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :

(الرِّبَا سَبْعُونَ حُوبًا أَيْسَرُهَا أَنْ يَنْكِحَ الرَّجُلُ أُمَّهُ)

‘সুদের সত্তুরটি গোনাহ রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বনিম্নটি হলো মায়ের সাথে যিনা করার তুল্য’ (ইবনে মাজাহ, সহীহ)।

প্রিয় ভাইয়েরা! সুদ আসমানী সকল শরীয়তেই হারাম, নিষিদ্ধ। ইয়াহুদীদের সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন :

{فَبِظُلْمٍ مِنَ الَّذِينَ هَادُوا حَرَّمْنَا عَلَيْهِمْ طَيِّبَاتٍ أُحِلَّتْ لَهُمْ وَبِصَدِّهِمْ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ كَثِيرًا. وَأَخْذِهِمُ الرِّبَا وَقَدْ نُهُوا عَنْهُ وَأَكْلِهِمْ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ مِنْهُمْ عَذَابًا أَلِيمًا}

‘ সুতরাং ইয়াহূদীদের যুলমের কারণে আমি তাদের ওপর উত্তম খাবারগুলো হারাম করেছিলাম, যা তাদের জন্য হালাল করা হয়েছিল এবং আল্লাহর রাস্তা থেকে অনেককে তাদের বাধা প্রদানের কারণে। আর তাদের সুদ গ্রহণের কারণে, অথচ তা থেকে তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অবৈধভাবে মানুষের সম্পদ খাওয়ার কারণে। আর আমি তাদের মধ্য থেকে কাফিরদের জন্য প্রস্তুত করেছি যন্ত্রণাদায়ক আযাব’ (সূরা আন-নিসা : ১৬০)

সুদ বিষয়ে এতসব কঠোর হুঁশিয়ারবাণী সত্ত্বেও অনেকেই ব্যাপারটিকে সহজভাবে নিয়ে সুদভিত্তিক লেনদেনে লিপ্ত হতে কুণ্ঠাবোধ করে না। যেকোনো উপায়ে অর্থ উপার্জন করাই যেন তাদের মূল লক্ষ্য। সম্পদ বৃদ্ধি করাই তাদের মূল টর্গেট। এ প্রকৃতির লোকের অভিধানে হারাম বলতে কোনো শব্দ নেই। রবং তাদের কাছে হারাম হলো যা অর্জন করা সাধ্যাতীত। তাদের কাছে হালাল হলো সে জিনিস যা যেকোনো উপায়ে অর্জন করা সম্ভব। তাদের হৃদয় আল্লাহর ভয় থেকে শূন্য। তারা আল্লাহর দীন থেকে বিমুখ। যদি কোনো সমাজের অবস্থা এ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে থাকে, তবে মনে করতে হবে অতি শীঘ্রই সে সমাজ আল্লাহর আযাবের আওতায় চলে আসবে। আর যে জীবন সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত সে জীবনে আদৌ কোনো কল্যাণ নেই। কেননা যে সম্পদ হারাম উৎস থেকে জমা করা হয় তা দুর্গন্ধময় আবর্জনায় ভরা নাপাক পানির ন্যায়, যার দুর্গন্ধে সবাই কষ্ট পায়।

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আজ মানুষে মাঝে সুদভিত্তিক লেনদেন প্রকটভাবে প্রচার পেয়েছে। এসব লেনদেনের সাথে জড়িত হওয়া একজন মুসলমানের জন্য কখনো উচিত নয়। এসব লেনদেন যতই লোভনীয় হোক না কেন তাতে কোনো বরকত নেই। এসব লেনদেনের মধ্যে একটি হলো অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ দেয়ার পর সে যখন সময় মতো আদায় করতে অপারগ হয় তখন তাকে সময় বাড়িয়ে দিয়ে তার ওপর বাড়তি প্রদেয় প্রয়োগ করা। তাকে বলা যে তুমি হয়তো এই মুহূর্তে ঋণ আদায় করবে, অন্যথায় তোমার জন্য সময় বাড়িয়ে দেব এবং তার বিনিময়ে তুমি এই পরিমাণ অতিরিক্ত টাকা আদায় করবে। ঋণ আদায়ের সময় যতই বাড়বে ততোই প্রদেয় টাকার অংকও বাড়বে। এটাই হলো জাহিলীযুগের রেবা বা সুদ যার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন :

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ}

‘ হে মুমিনগণ, তোমরা আল্ল¬াহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মুমিন হও। (সূরা আল বাকারা : ২৭৮)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :

{وَإِنْ تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ}

‘আর যদি তোমরা তাওবা কর, তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে। তোমরা যুলম করবে না এবং তোমাদের যুলম করা হবে না’ (সূরা আল বাকারা : ২৭৯)

সুদের আরেকটি প্রকার হলো কাউকে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে কোনো ফায়দা হাসিল করা। যেমন কাউকে সুনির্দিষ্ট অংকের টাকা দিয়ে বলা হলো, এই টাকা ফেরত দেয়ার সময় তুমি শতকরা এত টাকা হারে অতিরিক্ত দেবে। তদ্রƒপভাবে ঋণগ্রহীতার ওপর এরূপ শর্ত আরোপ করা হলো যে ঋণদাতা ঋণগ্রহীতার বাড়িতে বসবাসের সুযোগ পাবে, তার গাড়িতে চড়বে অথবা তাকে বিশেষ কোনো হাদিয়া দেবে ইত্যাদি। অনুরূপভাবে ব্যাংকসমূহে সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য যে টাকা রাখা হয়, যার ওপর মেয়াদ শেষে সুনির্দিষ্ট শতকরা হারে ব্যাংক থেকে লাভ দেয়া হয়, সেসবও সুদের অন্তর্ভুক্ত।

সুদভিত্তিক লেনদেনের মধ্যে এটিও একটি যে, কোনো পণ্য কোনো ব্যক্তির মেয়াদী-বিক্রির পদ্ধতিতে বিক্রয় করা হলো এবং সাথে সাথে বিক্রেতা ক্রেতার কাছ থেকে তা বর্তমান মূল্যে কিনে নিল যা মেয়াদী-বিক্রির বিক্রয় মূল্যের চেয়ে অনেক কম। এটাও একপ্রকার সুদী লেনদেন, যা হিলা-বাহানার মাধ্যমে করা হয়।

অর্থকড়ি লেনদেন করে তা হস্তগত না করেই উভয় পক্ষ পৃথক হয়ে যাওয়াও সুদী লেনদেনের একটি। অথচ নিয়ম হলো লেনদেনকারীরা পরিপূর্ণরূপে অর্থকড়ি হস্তগত না করে পৃথক হবে না। যেমন সোনা-রূপার অলঙ্কার টাকার পরিবর্তে বিক্রি করা হলো অথচ উভয় পক্ষ তাদের সম্পদ হস্তগত না করেই পৃথক হয়ে গেল। এ জাতীয় সুদী লেনদেন অনেক রয়েছে। তাই মুসলমানের উচিত সকল প্রকার সুদ থেকে দূরে থাকা। যে ব্যক্তি এ বিষয়ে উদাসীন তার আচরণে ধোঁকায় না পড়া। বরং সাধারণ মুসলমানদের উচিত সুদের ব্যাপারে কোনো সংশয় সৃষ্টি হলে তা আলেমদের জিজ্ঞাসা করে জেনে নেয়া। এ ক্ষেত্রে কোনো অলসতা বা শিথিলতা প্রদর্শন না করা। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সুদ ও তার ভয়াবহ পরিণাম থেকে হিফাযত করুন।

أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ : {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ} (سورة البقرة : 278)

بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآن الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ الْآياتِ وَالذِّكْر الحْكِيْمِ, أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَأَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ فَاسْتَغْفِرُوهُ إِنَّهُ هُو الْغَفُور الرَّحِيْمْ .

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى إِحْسَانِهِ وَالشُّكْرُ لَهُ عَلَى تَوْفِيْقِهِ وَامْتِنَانِهِ وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللهُ تَعْظِيْماً لِشَأْنِهِ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ الدَّاعِيْ إِلَى رِضْوَانِهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ وَأَتْبَاعِهِ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ وَسَلَّمَ تَسْلِيْماً كَثِيْراً، أمَّا بَعْدُ :

সুপ্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কেনা-বেচা একটি বহুল প্রচলিত ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অর্থ উপার্জনের একটি আধুনিক পদ্ধতি হিসেবে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। অনেকেই লাভের আশায় শেয়ার কেনাবেচা করছে। যেসব কোম্পানির শেয়ার কেনাবেচা হচ্ছে তার অধিকাংশই সুদভিত্তিক লেনদেনে অভ্যস্ত। এ জাতীয় কোম্পানির শেয়ার কেনার অর্থ ওই কোম্পানিতে অংশ নেয়া। তাই এ ব্যাপারে আমাদেরকে যথেষ্ট সতর্ক হতে হবে। যেসব কোম্পানি ইসলামী নীতিমালা অনুসরণ করে লেনদেন বা ব্যবসা চালাতে ওয়াদাবদ্ধ, আমরা কেবল সেসব কোম্পানির শেয়ারই ক্রয় করব। অন্যগুলো বর্জন করে চলব। এটাই হবে ঈমানের দাবি এবং সুদ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সহায়ক।

প্রিয় ভাইয়েরা! আমাদের দেশে সুদভিত্তিক বহু কোম্পানি রয়েছে যেগুলো সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে থাকে। আর আমাদের অনেকেই এসব কোম্পানির প্ররোচনায় প্রলুব্ধ হয়ে পড়ে, সুদের ওপর টাকা নিয়ে জমি-বাড়ি-গাড়ির মালিক হওয়ার জন্য শয়তানও এসে প্ররোচনা দেয়। বলে, তুমি প্রয়োজনগ্রস্ত। অন্যারা যেহেতু এভাবেই জমি-গাড়ি-বাড়ির মালিক হচ্ছে তাহলে তোমার অসুবিধা কোথায়? অতঃপর বান্দার ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে। লোভ সামলাতে না পেরে সহজ শর্তে সুদভিত্তিক ঋণ নিতে প্রস্তুত হয়ে যায়। নিজেকে জড়িত করে নেয় সুদী লেনদেনে। যারা এরূপ করে তাদের জন্য বলতে চাই- ধরুন আপনি সুদিভিত্তিক ঋণ নিয়ে একটি ফ্ল্যাটের মালিক হলেন, আপনি যেদিন সে ফ্ল্যাটে ঢুকলেন সেদিনই মালাকুল মওত এসে আপনার রূহ কবজ করে নিল। এবার বলুন আপনার অবস্থা কী দাঁড়াবে। আপনি কোন মুখে আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখীন হবেন! আপনার চেহারা তো সুদের কালিমায় মলীন!

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! যারা সুদভিত্তিক লেনদেনে জড়িত হয় তারা আল্লাহর সাথে নিজদের সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলে। আর আল্লাহর সাথে সম্পর্কচ্ছেদের অর্থ হলো চরম অসহায়ত্বে নিপতিত হওয়া। কেননা মানুষ খুবই দুর্বল। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া মানুষ নিজের কোনো উপকারই করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

{يَاأَيُّهَا النَّاسُ أَنْتُمْ الْفُقَرَاءُ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ}

‘হে মানুষ, তোমরা আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী আর আল্ল¬াহ অমুখাপেক্ষী ও প্রশংসিত’ (সূরা ফাতির : ১৫)

দু‘আ-মুনাজাত আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য চেয়ে নেয়ার অন্যতম মাধ্যম। তবে যারা হারাম খায় তারা এ মাধ্যমটিকে ছিন্ন করে ফেলে। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা বান্দার দু‘আ-মুনাজাত কবুল করা থেকে বিরত হয়ে যান। বান্দার ডাকাডাকিতে তিনি আর সাড়া দেন না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ধুলায় আবৃত এলোকেশী এক ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে, ইয়া রাব্বী ইয়া রাব্বী বলে আল্লাহকে ডাকে, অথচ তার দু‘আ কবুল হয় না, কেননা তার খাবার ছিল হারাম, তার পানীয় ছিল হারাম। সে হারাম খেয়ে তার শরীরে রক্ত মাংস গড়েছে। অতঃপর দু‘আ কিভাবে কবুল হবে’।

এ থেকে অনুমিত হয় যে সুদখোর আল্লাহর সাথে দু‘আর সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলে, সে দু‘আ করে, তবে আল্লাহ তার দুআ কবুল করেন না। আর যে ব্যক্তির দু‘আ আল্লাহ তা‘আলা কবুল করেন না সে নিঃসন্দেহে অসহায়, নিঃস্ব। প্রিয় ভাইয়েরা! আমরা কি চাই আমাদের দু‘আ-মুনাজাত কবুল না হোক? আমরা কি চাই যে আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাক? যদি না চাই তাহলে আসুন সকল প্রকার হারাম লেনদেন বর্জন করি। সর্বপ্রকার সুদী কারবার বর্জন করে হালাল রিযকের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে শ্রম ব্যয় করি।

প্রিয় ভাইয়েরা! সুদের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ শুধু অপবিত্র বলে মনে করলেই হবে না, বরং আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে। পদক্ষেপ নিতে অনিতিবিলম্বে তা থেকে সরে আসার। মক্কার মুশরিকরাও সুদের সম্পদ অপবিত্র মনে করত, কিন্তু তারা তা বর্জন করত না। এর প্রমাণ তারা যখন কাবার দেয়াল পূর্ণ নির্মাণ করার পদক্ষেপ নিল, তারা অন্যান্য হারাম সম্পদসহ সুদের টাকা বর্জন করল। কাবাঘর পূর্ণ নির্মাণের সময় আবু ওহাব ইবনে আবেদ ইবনে ইমরান ইবনে মাখযুম বলেছেন, ‘হে কুরাইশ গোত্রের লোকেরা! কাবাঘর নির্মাণে আপনাদের পবিত্র সম্পদ ছাড়া অন্যকিছু ঢুকাবেন না। এতে ব্যাভিচারী নারীদের যিনার বিনিময়ে অর্জিত টাকা ঢুকবে না। এতে সুদের টাকা ঢুকবে না। কারো প্রতি যুলম করে ছিনিয়ে আনা টাকা ঢুকবে না’।

লক্ষ্য করে দেখুন! জাহেলীযুগের কাফির মুশরিকরাও সুদের টাকাকে অবৈধ মনে করত, কিন্তু তারা ব্যাপকভাবে সুদের লেনদেন করত। এটাকে তারা অর্থ উপার্জনের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে মনে করত। তাই আমাদের সমাজে যারা সুদকে অপবিত্র মনে করা সত্ত্বেও সুদী লেনদেন চালিয়ে যায় তাদের সর্তক হওয়া উচিত।

প্রিয় ভাইয়েরা! সুদভিত্তিক অর্থব্যবস্থা অপবিত্র অর্থব্যবস্থা। ইয়াহুদীদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা অর্থব্যবস্থা। সুদভিত্তিক লেনেদেন ইউরোপেও একদিন হারাম ছিল। কেননা খৃষ্টধর্ম সুদকে হারামই বলেছে। ফরাসি বিপ্লব যখন ধর্মকে জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে গির্জায় ঢুকিয়ে দেয় তখন সুদের ওপর থেকেও ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়। আর সে সময় ইয়াহুদীরা ছিল বিত্তশালী এবং অ-ইয়াহুদীদের থেকে সুদের বিনিয়ে টাকা হাতিয়ে নিতে সিদ্ধহস্ত। শিপ্লবিপ্লব শুরু হওয়ার পর শিল্পপতিদের যখন তাদের প্রকল্পগুলোকে অর্থায়ন করার জন্য মূলধনের প্রয়োজন দেখা দিল, তখন তারা ইয়াহুদীদের থেকে সাড়া পেল। পক্ষান্তরে অন্যরা শিল্পপতিদের সুদভিত্তিক ঋণ দিতে অস্বীকার করল। আর এভাবেই শুরু হলো সুদনির্ভর শিল্পঋণ যা অন্যান্য ক্ষেত্রেও কালক্রমে প্রসারিত হলো। আর সে সময় ইউরোপ প্রায় সমগ্র পৃথিবীতেই কায়েম করে রেখেছিল অস্ত্রের বলে তাদের শাসন। সে সুবাদে সমগ্র পৃথিবীতেই সুদী লেনদেন ছড়িয়ে পড়ল। আর ইয়াহুদীরা সেই থেকে এখন পর্যন্ত সুদী লেনদেনের পেছনে কারবারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ রয়েছে।

ভাইয়েরা আমার! সুদ বর্জন করুন। ইয়াহুদী চক্রান্তে ফেঁসে গিয়ে নিজদের সর্বনাশ ডেকে আনবেন না। ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী লেনদেন করুন। আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমানায় নিজদের সীমাবদ্ধ রাখুন। এতেই রয়েছে বরকত ও কল্যাণ। এতেই রয়েছে দুনিয়া ও আখিরাতের নাজাত।

আল্লাহ আমাদেরকে সুদের ভয়াবহ পরিণতি থেকে হিফাযত করুন। আমাদের সমাজকে হিফাযত করুন। আমাদের দেশকে হিফাযত করুন।

اللَّهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ وَبَارَكْتَ عَلى إِبْرَاهِيْمَ وَعَلى آلِ إِبْرَاهِيْم إِنَّكَ حَمِيْدٌ مَجِيْدٌ وَارْضَ اللَّهُمَّ عَنِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ وَعَنِ الصَّحَابَةِ أَجْمَعِيْنَ وَعَنِ التَّابِعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنَ وَعَنَّا مَعَهُمْ بِمَنِّكَ وَكَرَمِكَ وَعَفْوِكَ وَإِحْسَانِكَ يَا أَرْحَمَ الرَّاحِمِيْنَ.

হে আল্লাহ! মুসলমান দাবি করা সত্ত্বেও যারা সুদী লেনদেনের সাথে জড়িত রয়েছে, যারা সুদ খাচ্ছে অথবা দিচ্ছে, তাদের সবাইকে হিদায়েত দান করুন। তাদেরকে গোমরাহী থেকে ফিরিয়ে আসার তাওফীক দিন।

হে আল্লাহ আপনি আমাদের সবাইকে হালাল রিযক অন্বেষণের তাওফীক দান করুন। হালাল ব্যবসা করার তাওফীক দান করুন। আপনি আমাদেরকে সকল প্রকার হারাম থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন।

হে আল্লাহ আপনি আমাদের অভাব-অনটন দূর করে দিন। আপনি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতের ভালাই ও কল্যাণ দান করুন। আপনি আমাদের সকল হালাল হাজতগুলো পূরণ করে দিন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ اللهِ: (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.