পাঠ সংক্ষেপ

যাকাত ইসলামের তৃতীয় রোকন। আল্লাহ তাআলা দেখতে চান যে, ধন পেয়ে ধনীরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কিনা? কিংবা অভাব অনটনে থেকে গরীবরা ধৈর্য ধারণ করে কিনা? ধনীরা যদি ধন-দৌলত লাভ করে আল্লার কৃতজ্ঞতা প্রতাশ করে এবং বিধান মতে ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে তারা পরীক্ষায় কৃতকার্য বলে গণ্য হবে। আর গরীবরা যদি ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তারা এর উপযুক্ত বিনিময় পাবে।

اَلْحَمْدُ لِلَّهِ دَائِمِ الْفَضْلِ وَالْإِحْسَانِ ذِيْ الْعَطَاءِ الْوَاسِعِ وَالْإِمْتِنَانِ، أَحْمَدُهُ سُبْحَانَهُ عَلَى مَا أَنْعَمَ فَأَغْنَى وَأَقْنَى وَأَشْكُرُهُ عَلَى نِعَمِهِ الَّتِيْ تَتْرَا، وَأَشْهَدُ أَنْ لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ، صَاحِبُ الْمَقَامِ الْمَحْمُوْدِ، اللَهُمَّ صَلِّ وَسَلِّمْ وَبَارِكْ عَلَى عَبْدِكَ وَرَسُوْلِكَ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيِنِ، أَمَّا بَعْدُ :

প্রিয় ভাই ও বন্ধুগণ! আল্লাহ তায়ালা সৃষ্টিতাত্ত্বিক বিশেষ কৌশলবশতঃ মানুষের স্বভাব-চরিত্র ও রিযক-এর ক্ষেত্রে সমতা সৃষ্টি করেননি। কাউকে ধনী বনিয়েছেন তো কাউকে গরীব করেছেন। কাউকে অঢেল সম্পদ দিয়েছেন আবার কাউকে নিঃস্ব বানিয়েছন। এটা আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ হেকমত। এমন না হলে পৃথিবীর শৃঙ্খলা বজায় থাকত না। মনুষের মধ্যে সবর ও শোকরের পরীক্ষা পূর্ণ হত না। আল্লাহ তাআলা বলেন

{قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَنْ يَشَاءُ وَيَقْدِرُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ}

‘ বল, আমরা রব যার জন্য ইচ্ছা রিযক প্রশস্ত করেন অথবা সঙ্কুচিত করেন কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না’ (সূরা সাবা:৩৬)

আল্লাহ তাআলা কাউকে প্রাচুর্য দিয়ে পরীক্ষা করেন আবার কাউকে অভাব-অনটন দিয়ে। এ পরীক্ষা বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা আল কুরআনে ইরশাদ করেন

{فَأَمَّا الْإِنْسَانُ إِذَا مَا ابْتَلَاهُ رَبُّهُ فَأَكْرَمَهُ وَنَعَّمَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَكْرَمَنِ. وَأَمَّا إِذَا مَا ابْتَلَاهُ فَقَدَرَ عَلَيْهِ رِزْقَهُ فَيَقُولُ رَبِّي أَهَانَنِ .كَلَّا بَل لَا تُكْرِمُونَ الْيَتِيمَ .}

‘ আর মানুষ তো এমন যে, যখন তার রব তাকে পরীক্ষা করেন, অতঃপর তাকে সম্মান দান করেন এবং অনুগ্রহ প্রদান করেন, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে সম্মানিত করেছেন। আর যখন তিনি তাকে পরীক্ষা করেন এবং তার ওপর তার রিযককে সঙ্কুচিত করেন, তখন সে বলে, আমার রব আমাকে অপমানিত করেছেন। কখনো নয়, বরং তোমরা ইয়াতীমদের দয়া-অনুগ্রহ প্রদর্শন কর না’ (সূরা আল ফাজর: ১৫-১৭)

উপর্যুক্ত আয়াত দ্বারা বুঝা যায় যে, সম্পদ যেমন আল্লাহর ভালোবাসার প্রতীক নয়, তেমনি অভাব-অনটন আল্লাহর ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ নয়। দারিদ্র্য ও ধনাঢ্যতা উভয়টাই আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পরীক্ষা।

আল্লাহ তাআলা দেখতে চান যে, ধন পেয়ে ধনীরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কিনা? কিংবা অভাব অনটনে থেকে গরীবরা ধৈর্য ধারণ করে কিনা? ধনীরা যদি ধন-দৌলত লাভ করে আল্লার কৃতজ্ঞতা প্রতাশ করে এবং বিধান মতে ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাহলে তারা পরীক্ষায় কৃতকার্য বলে গণ্য হবে। আর গরীবরা যদি ধৈর্যধারণ করে এবং আল্লাহর বণ্টনে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে তারা এর উপযুক্ত বিনিময় পাবে। তাই কারো হাতে সম্পদ থাকার অর্থ এ নয় যে আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট। ইরশাদ হয়েছে

{فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَتَزْهَقَ أَنْفُسُهُمْ وَهُمْ كَافِرُونَ}

‘ অতএব তোমাকে যেন মুগ্ধ না করে তাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানাদি, আল্লাহ এর দ্বারা কেবল তাদের আযাব দিতে চান দুনিয়ার জীবনে এবং তাদের জান বের হবে কাফির অবস্থায়’ (সূরা আত-তাওবা:৫৫)

যাকাত ইসলামের মৌলিক স্তম্ভসমূহের একটি। যাকাত বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশনা দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন

{خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ‘}

তাদের সম্পদ থেকে সাদকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। আর তাদের জন্য দু‘আ কর, নিশ্চয় তোমার দু‘আ তাদের জন্য প্রশান্তিকর। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (সূরা আত তাওবা:১০৩)

উপর্যুক্ত আয়াতে দেখা যায় যে, আল্লাহ তাআলা তার নবীকে যাকাত গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর কারণস্বরূপ আয়াতটিতে বলা হয়েছে যে, এর মাধ্যমে যাকাতদাতার আত্মিক পরিশুদ্ধি লাভ হয় ও তার সম্পদ নির্মল হয়। বস্তুত যাকাত, যাকাতদাতার আত্মাকে কৃপণতার ব্যাধি থেকে মুক্ত করে। তার মাঝে উদারতা ও দানশীলতার গুণ সৃষ্টি করে। এছাড়া যাকাত অবশিষ্ট সম্পদকে নির্মল করে দেয়। যাকাত আদায় করে যাকাতদাতার আত্মা শক্তিশালী হয়। সবল হয়। কেননা যাকাতদানকারী প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে যাকাত দিতে সক্ষম হয়। এভাবে তার পশুপ্রবৃত্তি অবদমিত হয়ে ঈমানী শক্তির উন্মেষ ঘটে। যাকাতের মাধ্যমে অবশিষ্ট মালে বরকত হয়। বহুলাংশে তা বৃদ্ধি পায়। বুখারী শরীফে আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত আছে-

(مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ)

‘ দান-সাদকা দ্বারা সম্পদ কখনো কমে না’ (বুখারী)

ভাইয়েরা আমার! যাকাত আদায় করুন। যাকাত আদায়ের কারণে অনেক বিপদ-আপদ ও দুর্যোগের ঘনঘটা হতে মুক্তি পাবেন। যাকাত আদায় করতে কখনো অলসতা করবেন না। লক্ষ্য করে দেখুন, যাকাত হিসাবে আল্লাহ তাআলা মাত্র ২.৫% শতাংশ ধার্য করেছেন। আবার এটা আপনারই আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর মধ্যে বণ্টনের ব্যবস্থা রেখেছেন। আর ৯৭.৫% শতাংশ সম্পদ নিজের কাছে রেখে দেয়ার পূর্ণ অধিকার আপনাকে দিয়েছেন। আর আপনি যা দান করবেন তার বিনিময় দুনিয়া ও আখেরাতে পরিপূর্ণরূপে পাবেন বরং বহুগুণ বর্ধিত আকারে পাবেন।

প্রিয় মুসলিম ভাই! আপনি যদি যাকাত আদায় না করেন, তাহলে যাকাতের যে মাল আপনার কাছে রয়ে যাবে তা কিন্তু সম্পূর্ণরূপে আপনার ব্যবহারে আসবে না। বরং এর অংশবিশেষ আপনার উত্তরাধিকারীদের হস্তগত হবে। তারা এ সম্পদ ভোগ করবে। এখন একটু চিন্তা করে দেখুন, যাকাত আদায় না করার কারণে পরিণামে এ সম্পদের অধিকারি হবে অন্যরা, আর এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে কেবল আপনাকেই। অতএব এ বিষয়ে একটু সচেতন হোন। সঠিকভাবে যাকাত আদায় করে দায়মুক্ত হোন। আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন করুন। খেয়াল রাখবেন, যাকাতের অংশ মূল সম্পদ হতে আলাদা করার সময় যাকাতের নিয়ত আপনার হৃদয়ে যেন উপস্থিত থাকে। কেননা সব কাজের ফলাফল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।

মুহতারাম হাযেরীন! যেসব মালের যাকাত দেয়া ওয়াজিব তা এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরছি:

এক. ক্ষেত-খামারে উৎপাদিত শস্যের যাকাত। ইরশাদ হয়েছে

{يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ }

‘ হে মুমিনগণ, তোমরা ব্যয় কর উত্তম বস্তু, তোমরা যা অর্জন করেছ এবং আমি যমীন থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে এবং নিকৃষ্ট বস্তুর ইচ্ছা করো না যে, তা থেকে তোমরা ব্যয় করবে (সূরা আল বাকারা: ২৬৭)

তাই ভূমি থেকে উৎপন্ন ফসলের যাকাত আদায় আবশ্যকীয়। তবে সুন্নাহ থেকে জানা যায় যে, যদি ফসল উৎপন্ন করতে কৃত্রিম সেচের আশ্রয় নিতে না হয়, তা হলে প্রদেয় যাকাতের পরিমাণ হবে এক দশমাংশ। আর যদি ফসল উৎপাদনে ব্যয়নির্বাহ করতে হয় এবং পানি সেচ দিতে হয়, তাহলে উৎপাদিত ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ দান করতে হবে।

দুই. গবাদি পশুর যাকাত

গবাদি পশু তথা উট,বকরী ও গরু ইত্যাদি যদি এমন হয় যে নিজে নিজে বিচরণ করে বছরের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিতে পারে, অর্থাৎ যদি এদের জন্য ঘাস পানি ইত্যাদির ব্যবস্থা করে দিতে না হয়, তাহলে এগুলোর যাকাত দিতে হবে। তবে এগুলো নেসাব পরিমাণ হতে হবে। উটের সর্বনিম্ন নেসাব হলো ৫ টি, বকরীর নেসাব ৪০ টি, আর গরুর নিসাব পূর্ণ হয় ৩০ টিতে। যেসব গবাদি পশুর ঘাস-পানির ব্যবস্থা বছরের অধিকাংশ সময় করতে হয় সেসব গবাদি পশুর যাকাত ওয়াজিব হয় না। তবে যদি এগুলোকে ব্যবসার উদ্দেশ্য কেনা হয় তাহলে তার মূল্যের ওপর বাণিজ্যিক পণ্যের ন্যায় যাকাত ওয়াজিব হবে।

তিন. বাণিজ্যিক পণ্যের যাকাত

আল্লাহ তায়ালা বাণিজ্যিক পণ্যের ওপর যাকাত আবশ্যক করছেন। আর বাণিজ্যিক পণ্য হলো সেসব বস্তু, যা ক্রয় বিক্রয় ও লাভের উদ্দেশ্যে মানুষ তৈরি করে বা নিজের মালিকানাভুক্ত করে। সেটা আহার্য বস্তুও হতে পারে, পোশাক-পরিচ্ছদও হতে পারে, যানবাহন কিংবা প্রসাধনী সামগ্রীও হতে পারে। ব্যবসার সব ধরনের পণ্য এর অন্তর্ভুক্ত। এ ধরনের পণ্যের মূল্য আর্থিক নেসাবের সমপরিমাণ হলে, স্বত্ববান হওয়ার পর এক বছর অতিক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্যের ওপর ২.৫% হারে যাকাত ফরয হবে। ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয় করা জমির ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য হবে। বছরান্তে জমির যে মূল্য দাঁড়াবে সে মূল্যের ওপর ২.৫% হারে যাকাত ফরয হবে।

চার. সোনা-রুপা ও নগদ অর্থের যাকাত

আল্লাহ তাআলা সোনা-রুপার ওপর যাকাত ধার্য করেছেন। সোনা-রুপা অত্যন্ত মূল্যবান ধাতু। আল্লাহ তা‘আলা বলেন

{وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلَا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لِأَنْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ}

‘যারা সোনা ও রুপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আযাবের সুসংবাদ দাও। যেদিন জাহান্নামের আগুনে তা গরম করা হবে, অতঃপর তা দ্বারা তাদের কপালে,পার্শ্বে এবং পিঠে সেঁক দেয়া হবে। (আর বলা হবে) ‘এটা তা-ই যা তোমরা নিজদের জন্য জমা করতে (সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫)

কুরআনের নির্দেশনা মতে, সোনা-রুপার যাকাত আদায় করতে হবে। মুদ্রা হিসেবে সোনা-রুপার পরিবর্তে বর্তমানে যে কাগুজে-মুদ্রা প্রচলিত আছে এবং অনুরূপ আর যত মুদ্রা রয়েছে তারও যাকাত দিতে হবে। তাই ক্রেডিট কার্ড, ভিসা কার্ড, প্রাইজবন্ড ও শেয়ার ইত্যাদির বিপরীতে যে অর্থ রয়েছে তারও যাকাত দিতে হবে।

চার. শেয়ার ও বিভিন্ন কোম্পানির যাকাত

বিভিন্ন কোম্পানি থেকে যে শেয়ার ক্রয় করা হয় তা দুই প্রকার:

- বিনিময়যোগ্য শেয়ার, যা লাভের উদ্দেশ্যে ক্রয় করা হয়েছে। এ ধরনের শেয়ারর মূল্য বাড়ে বা কমে এবং চহিদার সময় তা উপস্থাপন করতে হয় । এ ধরনের শেয়ারের বিপরীতে যে অর্থ আসবে বছর শেষে তার চলতি মূল্য হিসাব করে যাকাত দিতে হবে। কেননা এগুলো মুদ্রাসদৃশ।

-যে শেয়ারের বিনিময়ে পণ্যের রশিদ গ্রহণ করা হয়েছে এবং এর বিপরীতে পণ্য গ্রহণ করতে হবে, এ ধরনের পণ্যের ওপর যদি বছর অতিক্রান্ত হয় তাহলে যাকাত দিতে হবে। কিন্তু যদি পণ্য ব্যবহার করে ফেলা হয়, তাহলে এর যাকাত দিতে হবে না।

ছয়. বাড়িঘরের যাকাত

আপনি যে বাড়িতে বাস করেন কিংবা যে গাড়িটি ব্যবহার করেন তার ওপর কোনো যাকাত নেই। কেননা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

(لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ فِيْ عَبْدِهِ وَلَا فَرَسِهِ صَدَقَةٌ)

‘ মুসলমানের ক্রীতদাস কিংবা ঘোড়ার ওপর যাকাত নেই’ (মুসলিম)।

أقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا وَاسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُؤْمِنِيْنَ، فَاسْتَغْفِرُوْهُ إنَّهُ هُوَ الَغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ

اَلْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ. الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ. مَالِكِ يَوْمِ الْدِّيْنِ. أَحْمَدُهُ سُبْحَانَهُ وَأَشْكُرُهُ وَأَشْهَدُ أَن لَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَ مُحَمَّداً عَبْدُهُ وَرَسْولُهُ صَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ وَبَارَكَ عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ وَالتَّابِعِيْنَ لَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الْدِّيْنِ، أَمَّا بَعْدُ :

মুসলিম ভাই ও বন্ধুগণ! যাকাত পরিশোধ করা ফরয। আল্লাহ তাআলা বলেন,

{إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَاِبْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ}

‘ নিশ্চয় সাদকা হচ্ছে ফকীর ও মিসকীনদের জন্য এবং এতে নিয়োজিত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য (তা বণ্টন করা যায়) দাস আযাদ করার ক্ষেত্রে, ঋণগ্রস্তদের মধ্যে, আল্লাহর রাস্তায় এবং মুসাফিরদের মধ্যে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়’ (সূরা আত তাওবা: ৬০)

যাকাতের বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ যে, আল্লাহ তায়ালা এর খাত বর্ণনার দায়িত্ব নিজেই নিয়েছেন এবং আল কুরআনে তা পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছেন। অতএব, আপনারা যাকাত পরিশোধের ব্যাপারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করুন। আল্লাহকে ভয় করুন। আপনার নিকট আল্লাহ তা‘আলা গরীবদের যে হক রেখেছেন তা যথার্থরূপে আদায় করুন। ইরশাদ হয়েছে

{إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا}

‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে’ (সূরা আন নিসা:৫৮)

অভাবগ্রস্ত ও নিঃস্ব মানুষ, যাদের জীবনধারণের উপকরণ নেই, কিংবা থাকলেও পর্যাপ্ত নয়, অথবা যাদের আয়ের কোনো ব্যবস্থা নেই, কিংবা কর্মক্ষম নয়, তাদেরকে এক বছরের ব্যয় পরিমাণ যাকাত দেওয়া উচিত। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি বিবাহ করতে ইচ্ছুক, কিন্তু ব্যয়নির্বাহ করতে সক্ষম নয়, এমন ব্যক্তিবর্গকে যাকাতের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা যায়। কেননা জীবনধারণ ও বিবাহ মানুষের জৈবিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন। তবে যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্রহীতার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তাকে যদি যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত মনে হয় তাহলে যাকাত দেয়া যাবে নতুবা নয়। অনুরূপভাবে ঋণগ্রস্তকে ঋণের দায় থেকে মুক্ত করার জন্য যাকাত দেওয়া যাবে। যাকাতের অর্থ দিয়ে মুসলিম যুদ্ধবন্দিদেরকে মুক্ত করা যাবে এবং আল্লাহর জন্য যারা সত্যিকার অর্থে জিহাদ করছেন তাদেরকেও সাহায্য করা যায়। যে মুসাফির ব্যক্তি সফরে থাকাকালে অভাবগ্রস্ত হয়ে পড়েছে সেও যাকাতের মাল গ্রহণ করতে পারবে। এটা বিশ্বপ্রতিপালক মহান আল্লাহ তা‘আলার বিধান। এর প্রতি আমাদের সকলের শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।

প্রিয় মুসলিম ভাই! আপনি যদি স্বাবলম্বী ও সচ্ছল হয়ে থাকেন তাহলে কখনো যাকাত গ্রহণের চিন্তা করবেন না। যাকাত থেকে শত ক্রোশ দূরত্ব বজায় রাখবেন। কেননা যাকাত হলো মালের ময়লা, যা কেবল গরীবদের জন্য বৈধ। ধনীদের জন্য তা বৈধ নয়। ধনীদের জন্য যাকাত গ্রহণ করা হারাম। বুখারী ও মুসলিম শরীফে ইবনে ওমর রাযি থেকে বর্ণিত এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

(لَا تَزَالُ الْمَسْأَلَةُ بِأَحَدِهِمْ حَتَّ‍ى يَلْقَى اللهَ وَلَيْسَ فِيْ وَجْهِهِ مُزْعَةُ لَحْمٍ)

যে ভিক্ষা করে বেড়ায়, আল্লাহর সাথে সে এমনভাবে সাক্ষাৎ করবে যে, তার চেহারায় কোনো গোশ্ত থাকবে না’ (বুখারী ও মুসলিম)।

যে ব্যক্তি মানুষের কাছে হাত পাতার সূচনা করবে আল্লাহ তার অভাবগ্রস্ততার দরজা খুলে দিবেন। আর অধিক পরিমাণে উপায়-উপকরণ থাকা বা প্রচুর পরিমাণে ধনদৌলতের মালিক হওয়ার নাম প্রাচুর্য নয়। বরং প্রকৃত প্রাচুর্য হলো মনের প্রাচুর্য। মনের দিক দিয়ে যে ধনী সেই প্রকৃত ধনী।

বন্ধুগণ! এমন অনেক লোক আছে যারা যাকাত খাওয়ার যোগ্য নয়, কিন্তু তারা যাকাত পাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। তাদেরকে আল্লাহ শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য দিয়েছেন, কর্মক্ষম বনিয়েছেন, তা সত্ত্বেও তারা যাকাতের জন্য দ্বারে-দ্বারে ঘোরে। এমন লোকদের যাকাত দিয়ে প্রকৃত অভাবীলোকদের হক নষ্ট করবেন না। এজন্য যাকাত দেয়ার ক্ষেত্রে প্রকৃত হকদার খুঁজে পেতে যারপরনাই চেষ্টা করতে হবে। যারা অভাবী, কিন্তু মানুষের কাছে হাত পাতে না। যারা কষ্ট করে, কিন্তু চাওয়ার কাছেও যায় না। যারা পরিবার পরিজনের ব্যয়নির্বাহ করতে হিমশিম খায়, তাদের খুঁজে বের করুন। তাদের খবর নিন যারা বিভিন্ন ঋণে জর্জরিত। এসব লোককে যাকাতের অর্থ দিয়ে ভারমুক্ত করুন, দায়মুক্ত করুন।

মুহতারাম মুসল্লিয়ান! ধনীরা যদি সুষ্ঠুভাবে যাকাত আদায় করে তাহলে যেমন দারিদ্র্য হ্রাস পাবে তেমনি সমাজ হতে অনেক অপরাধ দূর হবে। অভাবের তাড়নায় যারা অপরাধকর্মে জড়িয়ে পড়ে তাদের অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পাবে। এজন্য যাকাত আদায়ে সচেষ্ট হওয়া প্রত্যেক ধনীর অবশ্য কর্তব্য। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে বুঝার ও আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন!

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

হে আল্লাহ! আপনি আমাদেকে যাকাত আদায়ের তাওফীক দিন। যারা হকদার তাদের হাতে যাকাতের অর্থ ও সম্পদ তুলে দেয়ার তাওফীক দিন। যাকাত ফরয হওয়া সত্ত্বেও যারা যাকাত দেয় না তাদের আপনি হিদায়েত করুন। হে আল্লাহ! আমাদের দেশকে আপনি দারিদ্র্য মুক্ত করুন। মুসলিমবিশ্বকে আপনি দারিদ্র্য মুক্ত করুন। আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন।

عبَادَ اللهِ رَحمِكُمُ الله ِ: (إِنَّ اللهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ والإحْسَانِ وَإيْتَاءِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالمْنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُوْنِ) اُذْكُرُوا اللهَ يَذْكُرْكُمْ وَادْعُوْهُ يَسْتجِبْ لَكُمْ وَلَذِكْرُ اللهِ تَعَالَى أَعْلَى وَأَعْظَمُ وَأَكْبَرُ.